দেশজুড়ে ছেঁড়া, ফাটা, ত্রুটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোটের ব্যবহারে वृद्धि হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক সকল ব্যাংক ও শাখাকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। এই নির্দেশনা অনুযায়ী, অবৈধ বা ক্ষতিগ্রস্ত নোট গ্রহণ ও বিনিময় করতে হবে, অন্যথায় ব্যাংকের বিরুদ্ধে জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রোববার একটি অফিসিয়াল নির্দেশনা জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, জনসাধারণের স্বাভাবিক নগদ লেনদেন নিশ্চিত করতে সব তফসিলি ব্যাংকের শাখা এই নিয়ম মানতে বাধ্য। নির্দেশনায় বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত বা ময়লাযুক্ত নোট গ্রহণ ও বিনিময় করতে হবে এবং পরিবর্তে নতুন বা পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোট সরবরাহ করতে হবে। ব্যাংকগুলো ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা মানছে তবে বাজারে এখনো অপ্রচলিত বা ক্ষতিগ্রস্ত নোটের আধিক্য রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য লেনদেনে অসুবিধা সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘ক্লিন নোট পলিসি’ কার্যকর করে ব্যাংকগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ছোট মূল্যমানের ৫, ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোট নিয়মিতভাবে গ্রহণ ও বিনিময় করতে হবে এবং গ্রাহকদের ব্যবহারযোগ্য বা নতুন নোট প্রদান করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যদি কোনো ব্যাংক শাখা এ সেবা দিতে গাফিলতি করে বা অনীহা দেখায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার অধীনে জারি এই নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
Category: অর্থনীতি
-

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমল
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর স্বর্ণের দামে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। বিশ্ববাজারে সোমবার মূল্যবান ধাতুটির দাম প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ হলো শক্তিশালী ডলার এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে বেড়ে চলা উদ্বেগ। তেলের দাম বাড়তে থাকায় অর্থনৈতিক অস্থিরতা আরও গভীর হচ্ছে, যার ফলে সুদের হার কমানোর সম্ভাবনাও ধীরে ধীরে কমছে। এই পরিস্থিতিতে স্বর্ণসহ অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দাম বাড়তে শুরু করেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়, সোমবার (১৩ এপ্রিল) দুপুর ১২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত স্পট গোল্ডের দাম ০.৪% কমে গিয়েছিল, যা প্রতি আউন্স ৪,৭২৬.৬৪ ডলারে দাঁড়ায়। এর আগে, দিন শুরুতে এটি ৭ এপ্রিলের পর সর্বনিম্ন ৪,৬৪৩ ডলারে পৌঁছেছিল। জুন ডেলিভারির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ফিউচার দাম ০.৮% কমে ৪,৭৪৮.৭০ ডলারে নামিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ডলার সূচক ০.৩% শক্তিশালী হয়েছে এবং তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি অবরোধের প্রত্যুত্তর প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা স্বর্ণের দাম কমার পেছনে একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, শান্তি আলোচনার ব্যর্থতা যুদ্ধবিরতির আশা ধাক্কা খেয়েছে। এর ফলে ডলার এবং তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্বর্ণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শুরু থেকেই, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-ইরানের সংঘর্ষ শুরুর পর স্পট গোল্ডের দাম ১১% এর বেশি কমে গেছে। সাধারণত, মুদ্রাস্ফীতি ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা স্বর্ণের চাহিদা বাড়ায়, তবে উচ্চ সুদের হার স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদের জন্য নেতিবাচক। শক্তিশালী ডলার অন্যান্য মুদ্রাধারীদের জন্য ডলার-নির্ধারিত স্বর্ণ কেনাকাটা আরও ব্যয়বহুল করে তোলে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তেলের দাম যখন ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা বেড়ে যায়, যা স্বর্ণের মূল্যকে দুর্বল করে।
ব্যবসায়ীদের মতে, চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা খুবই কম, কারণ উচ্চ জ্বালানি মূল্য সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতিকে আরও বাড়াতে পারে এবং গভীর শিথিলতার সুযোগকে কমিয়ে দেয়। ফলে মূল্যবান ধাতুগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
-

৮ মাসে পণ্যবাণিজ্যে ঘাটতি ১ হাজার ৬৯১ কোটি ডলার; আমদানি বাড়ায় চাপ
চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম আট মাসে দেশে পণ্যবাণিজ্যে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৬৯১ কোটি ডলারে—যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এসব তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেন সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে আমদানি হয়েছে ৪৬.১৪ বিলিয়ন (৪,৬১৭ কোটি) ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৬ শতাংশ বৃদ্ধি। ওই সময়ে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩০.০৩ বিলিয়ন (৩,০০৩ কোটি) ডলার—গত বছরের ২৯.২৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় মাত্র ২.৬ শতাংশ বাড়ল। আমদানি ও রপ্তানির এই ব্যবধানেই বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার মূল কারণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
খাত সংশ্লিষ্ট ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রমজানকে কেন্দ্র করে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, বিভিন্ন ডাল ও খেজুরসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বেড়ে গোটা আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সহমতে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম উর্ধ্বগামী থাকায় আরও চাপ তৈরি হয়েছে, ফলে রপ্তানি বৃদ্ধি সীমিত থাকায় ঘাটতি বাড়ছে। তারা সতর্ক করেছেন—অস্থির আমদানির ধারা নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি বাড়াতে দ্রুত নীতিমূলক পদক্ষেপ না নিলে দেশের বৈদেশিক ব্যালান্স আরও চাপে পড়বে।
চলতি হিসাব বা কারেন্ট অ্যাকাউন্টে পরিস্থিতি এখনও সামান্য ঋণাত্মক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি শেষে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি ডলার; আগের অর্থবছরের একই সময়ে তা ছিল ১৪৭ কোটি ডলার।
সমগ্র লেনদেনের পরিপ্রেক্ষিতে (ওভারঅল ব্যালান্স) বাংলাদেশ ভালো অবস্থায় আছে—আলোচিত সময়ে সামগ্রিক লেনদেনের উদ্বৃত্ত হয়েছে ৩৪৩ কোটি ডলার, যেখানে আগের বছর একই সময়ে এটি ঋণাত্মক ১১৫ কোটি ডলার ছিল।
প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক সঙ্কেত আছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ২,২৪৫ কোটি ডলার; আগের বছরে একই সময়ে ছিল ১,৮৮৭ কোটি ডলার—প্রায় ২১.৪ শতাংশ বৃদ্ধিতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়েছে।
তবে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কিছুটা কমেছে—গত বছর জুলাই-ফেব্রুয়ারিতে এফডিআই ছিল ১০৬ কোটি ডলার; চলতি অর্থবছরে তা নামিয়ে এসেছে ৮৭ কোটি ডলারে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে পরটফোলিও বিনিয়োগও নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে; প্রথম আট মাসে নেট বিদেশি বিনিয়োগে নেমে এসেছে ৮ কোটি ডলার (ঋণাত্মক), যা আগের বছরটিও একই রকম ছিল।
সংক্ষেপে, চলতি অর্থবছরের আট মাসে উদ্বৃত্ত রেমিট্যান্স ও সামগ্রিক ব্যালান্স ভালো হওয়ার পরও দ্রুত বাড়তি আমদানি ও তুলনামূলকভাবে ধীর রপ্তানি বৃদ্ধিই পণ্যবাণিজ্যের ঘাটতি বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈদেশিক ব্যালান্স স্থিতিশীল রাখতে আমদানি নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি প্রকৌশল উন্নয়ন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে দ্রুত কর্মসূচি নেওয়া জরুরি।
-

নিট লোকসানে ১৭ ব্যাংক; সিএসআর ব্যয় প্রায় অর্ধেকে
২০২৪ সালে দেশের ব্যাংক খাত গভীর অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। বছরের বেশি সময় ব্যাংকগুলোর মুনাফা সংকুচিত হওয়ায় ১৭টি ব্যাংক নিট লোকসানে চলে যায় এবং যেসব ব্যাংক মুনাফা করেছে, তাদের আয়ও প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি। রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে আসে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে (জানুয়ারি—ডিসেম্বর) দেশের ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক সিএসআর খাতে মোট ব্যয় করেছে মাত্র ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকা।これは আগের বছরের তুলনায় ২৭০ কোটি ৯১ লাখ টাকা বা প্রায় ৪২ শতাংশ কম। গত এক দশকে সিএসআর খাতে এটিই সর্বনিম্ন ব্যয়; পূর্বের নিম্নতম রেকর্ড ২০১৫ সালে ছিল ৫২৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। সেই তুলনায় এবার ব্যয় প্রায় ১৮২ কোটি টাকা (৩৪.৫৭ শতাংশ) কমেছে, যা খাতটিতে নতুন নিম্নমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সিএসআর খাতে ব্যয় ছিল ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা—এটি ২০২৩ সালের তুলনায় ৩০৮ কোটি টাকা (৩৩ শতাংশ) কম। ২০২৩ সালে ব্যয় ছিল ৯২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা, এবং ২০২২ সালে এটি ছিল ১,১২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে সিএসআর ব্যয় প্রায় ৫১৩ কোটি টাকা বা ৪৫ শতাংশের বেশি কমেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তনের প্রভাব ব্যাংকিং খাতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকের অনিয়ম, লুটপাট ও অর্থ পাচারের তথ্য প্রকাশ হলে কাগজে-কলমে দেখানো মুনাফার বিপরীতে প্রকৃত আর্থিক চিত্র সামনে আসে। খেলাপি ঋণ বাড়ায় প্রকৃত লোকসানের হিসাবও প্রকাশ পায়। বিশেষ করে শরিয়াভিত্তিক কয়েকটি ব্যাংক বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে; কিছু শিল্পগোষ্ঠীর ঋণ অনিয়ম ও অর্থ পাচারের প্রভাবও এতে যুক্ত। পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ায় সরকার দুর্বল ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতা রক্ষায় একাধিক ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেয়ার পথে।
ব্যাংকাররা আরও বলছেন, সিএসআর ব্যয় কমার পিছনে রাজনৈতিক চাপও একটি বড় কারণ। রাজনৈতিক সরকারের সময় বিভিন্ন স্তর থেকে অনুদান বা সহায়তার জন্য চাপ থাকত এবং অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত সিএসআরের আওতার বাইরে ব্যয় করা হতো। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন ও আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর সেই চাপ কমেছে, ফলে এখন ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে সতর্কভাবে সিএসআর ব্যয় করছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সিএসআর বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক প্রভাব বা অনির্দিষ্ট চাপের কারণে অনেক সময় এই অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয়, যা সামাজিক দায়বদ্ধতার মূল উদ্দেশ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে তাদের নিট মুনাফার একটি অংশ সিএসআর খাতে ব্যয় করতে হয়: এর মধ্যে ৩০ শতাংশ শিক্ষা, ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্য, ২০ শতাংশ পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এবং বাকী ২০ শতাংশ অন্যান্য খাতে ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে নির্দেশনা ঠিকমতো মানা হচ্ছে না—২০২৫ সালে সরবরাহ করা বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি (৩৬ শতাংশ) খরচ করেছে ‘অন্যান্য’ খাতে; শিক্ষায় ব্যয় হয়েছে ২৮.৫৩ শতাংশ এবং পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে মাত্র ১০ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী আলোচিত সময়ে ১১টি ব্যাংক সিএসআর খাতে একটিও টাকা ব্যয় করেনি। ঐ তালিকায় রয়েছে: জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।
তথ্য থেকে আরও জানা যায়, ২০২৪ সালে লোকসানে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে আছে জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। এদের মধ্যে ছয়টি ব্যাংক মুনাফা অর্জন না করেও সিএসআর খাতে অর্থ ব্যয় করেছে—রয়েছে এবি ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।
সংক্ষেপে, ব্যয়ের নাটকীয় এই হ্রাস ব্যাংকিং খাতের জটিল আর্থিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। অনুকূল আর্থিক ফলাফল ও শক্তিশালী হিসাব-নিরীক্ষা ছাড়া ভবিষ্যতে সিএসআর খাতের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে—এজন্য দফতরী নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জরুরি বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
-

১৭ ব্যাংক লোকসানে; সিএসআর ব্যয় প্রায় অর্ধে নামল
২০২৪ সালের আর্থিক আচড়ের ছায়ায় দেশের ব্যাংকখাত বড় রকমের ধাক্কা খেয়েছে। চলতি বিবরণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে ১৭টি ব্যাংক নিট মুনাফা অর্জন করতে পারেনি এবং বাকি ব্যাংকগুলোর আয়ও প্রত্যাশিত স্তরে পৌঁছায়নি। এর প্রকৰ্ফণে ২০২৫ সালে (জানুয়ারি–ডিসেম্বর) ব্যাংকগুলোর কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যয় প্রায় অর্ধে নেমে এসেছে — বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ রিপোর্টে এমনই তথ্য ধরা পড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক মিলিয়ে সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে মাত্র ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকা। আগের বছরের তুলনায় এটি ২৭০ কোটি ৯১ লাখ টাকা কম, যা প্রায় ৪২ শতাংশের সমান। গত এক দশকে এটিই সিএসআর খাতে সর্বনিম্ন ব্যয়; ২০১৫ সালের সর্বনিম্ন রেকর্ড ছিল ৫২৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, সেই তুলনায় এবার খরচ প্রায় ১৮২ কোটি টাকা (প্রায় ৩৪.৫৭ শতাংশ) কমেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে সিএসআর খাতে ব্যয় ছিল ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা; ২০২৩ সালে এটি ছিল ৯২৪ কোটি ৩২ লাখ এবং ২০২২ সালে ১,১২৯ কোটি টাকা। দুই বছরের ব্যবধানে সিএসআর ব্যয় কমেছে প্রায় ৫১৩ কোটি টাকা, যা শতকরা হিসেবে ৪৫ শতাংশের বেশি।
শাখা-প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকারদের তথ্য মতে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরবর্তী সরকার পরিবর্তন ব্যাংকিং খাতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। সূত্র ফাঁস, অনিয়ম ও অর্থপাচারের খবর প্রকাশ পেলে কাগজে-কলমে দেখানো মুনাফার তুলনায় প্রকৃত আর্থিক চিত্র সামনে আসে; খেলাপি ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব লোকসানও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে শরিয়াভিত্তিক কিছু ব্যাংক বড় চাপের মধ্যে পড়ে; অনেক ক্ষেত্রে কিছু শিল্পগোষ্ঠীর ঋণ অনিয়ম ও অর্থপাচারের প্রভাব পরিষ্কার হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরকার কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ব্যাংকারদের বক্তব্য, সিএসআর ব্যয় কমার আরেকটি কারণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। রাজনৈতিক সরকারের সময় বিভিন্ন স্তর থেকে অনুদান বা সহায়তার দাবি থাকায় ব্যাংকগুলো প্রচণ্ড চাপ অনুভব করত; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অনুষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন প্রকল্পে চাপের ফলেই অনেক সময় সিএসআর অর্থ অনুচিতভাবে ব্যবহার হতো। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন ও আগের সরকার বদলের পর এই চাপ অনেকটাই কমেছে, ফলে ব্যাংকগুলো এখন তুলনামূলকভাবে সংযতভাবে সিএসআর ব্যয় করছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করান, সিএসআর খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক প্রভাব বা চাপের কারণে যদি এই অর্থ অনুৎপাদনশীল কাজে ব্যয় হয়, তবে সামাজিক দায়বদ্ধতার মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে তাদের নিট মুনাফার একটি অংশ সিএসআর খাতে ব্যয় করতে হয়: তার মধ্যে ৩০ শতাংশ শিক্ষায়, ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে, ২০ শতাংশ পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এবং বাকি ২০ শতাংশ অন্যান্য খাতে ব্যয় করার কথা বলা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নির্দেশনা মানা হচ্ছে না—২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি (৩৬ শতাংশ) ব্যয় করেছে ‘অন্যান্য’ শিরোনামের কাজে, শিক্ষায় ব্যয় হয়েছে ২৮.৫৩ শতাংশ, পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে মাত্র ১০ শতাংশ।
রিপোর্ট অনুযায়ী ওই সময়ে ১১টি ব্যাংক সিএসআর খাতে একটাও অর্থ ব্যয় করেনি। সেই ব্যাংকগুলো হল: জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।
আর ২০২৪ সালে লোকসানে থাকা ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে: জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।
তথ্য অনুযায়ী, এই লোকসানে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে ছয়টি প্রতিষ্ঠান মুনাফা না করেও সিএসআর খাতে কিছু অর্থ ব্যয় করেছে; তারা হলেন: এবি ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।
সংক্ষেপে, আর্থিক ক্ষত ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ব্যাংকগুলোর CSR নীতি ও ব্যয়ের ধরনে গুরুত্বপুর্ণ প্রভাব ফেলেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সিএসআর কার্যক্রমকে পুনর্সংগঠিত করা, স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং প্রকৃত সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় নিশ্চিত করাই ভবিষ্যতে খাতের সুস্থতার জন্য জরুরি।
-

৮ মাসে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি ছাড়াল ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি
রপ্তানির তুলনায় আমদানি দ্রুত বাড়ায় এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির ফলে চলতি অর্থবছর (২০২৫-২৬) প্রথম আট মাসে দেশের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি এক হাজার ৬৯১ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এটি বাংলাদেশি টাকায় প্রায় দুই লাখ সাত হাজার কোটি টাকারও বেশি। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঘাটতি ছিল এক হাজার ৩৭১ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেনের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য ধরা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের বক্তব্য, ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল ও খেজুরসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি গেল ফেব্রুয়ারিতে রমজানকে সামনে রেখে বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক আমদানির পরিমাণ বেড়ে গেছে। একই সময়ে রপ্তানি আয়ে অপ্রত্যাশিত ধীরগতি দেখা যাওয়ায় পণ্য বাণিজ্যের ঘাটতি আরও বাড়েছে। খাতগুলো বলছে—অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে আমদানি বিধির কঠোর প্রয়োগ ও রপ্তানি বাড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিস্তারিত তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়জুড়ে দেশি ব্যবসায়ীরা মোট পণ্য আমদানি করেছেন ৪৬.১৪ বিলিয়ন ডলার (প্রায় চার হাজার ৬১৭ কোটি ডলার), যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫.৬ শতাংশ বেশি। তুলনায় গত অর্থবছরে একই সময়ে আমদানি ছিল ৪৩.৭৪ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩০.০৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে পাওয়া ২৯.২৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ২.৬ শতাংশ বেশি। আমদানি ও রপ্তানির এ ব্যবধানেই চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি বেড়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি থাকায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি থাকায় বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়ছে।
চলতি হিসাব (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) সম্পর্কে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, চলতি হিসাব বর্তমানে সামান্য ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। ফেব্রুয়ারি শেষে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি ডলার; আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১৪৭ কোটি ডলার।
অন্যদিকে সামগ্রিক ব্যালান্স ভালো অবস্থায় আছে; আলোচিত সময়ে সামগ্রিক লেনদেনের ব্যালান্স ৩৪৩ কোটি ডলার সঙ্কলিত হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ঋণাত্মক ১১৫ কোটি ডলারের অবস্থানের তুলনায় অনেক ভালো।
রেমিট্যান্স ক্ষেত্রেও ইতিবাচক সাড়া দেখা গেছে—অর্থবছরের প্রথম আট মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা মোট ২২.৪৫ বিলিয়ন ডলার (দুই হাজার ২৪৫ কোটি ডলার) রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন; আগের বছরে একই সময়ে ছিল ১৮.৮৭ বিলিয়ন ডলার। ফলে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২১.৪ শতাংশ।
পর্তুক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমেছে; গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে এফডিআই ছিল ১০৬ কোটি ডলার, চলতি অর্থবছরে তা প্রায় ৮৭ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। শেয়ারবাজারে পোর্টফোলিও বিনিয়োগও নেতিবাচক অবস্থায় রয়ে গেছে—অর্থবছরের প্রথম আট মাসে শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ (নিট) থেকে প্রায় ৮ কোটি ডলার বেরিয়ে গেছে, যা আগের বছরও একই রকমভাবে ছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বহির্বিশ্বের মূল্যউদ্রেক ও ভোগ্যপণ্যের ভলিউম বাড়ায় আমদানির উপর নজরদারি শক্ত করলে এবং রপ্তানি বিস্তারে নীতিগত সহায়তা বাড়ালে দ্রুত ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। নতুবা জ্বালানি-সহ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে দেশের অর্থনীতির সংকট আরও বাড়তে পারে।
-

৮ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দুই লাখ কোটি টাকার ওপরে
চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম আট মাসে রপ্তানির তুলনায় আমদানির দ্রুত বৃদ্ধির কারণে দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি বৃদ্ধিপেতে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৯১ কোটি ডলারে — যা বাংলাদেশি টাকায় দুই লাখ সাত হাজার কোটি টাকারও বেশি। আগের অর্থবছরের একই সময়ের ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৩৭১ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ব্যালেন্স অব পেমেন্ট (বিওপি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই চিত্রটি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল কারণ হলো জ্বালানিসহ বেশিরভাগ পণ্যের বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং বিশেষ করে রমজানকে সামনে রেখে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল ও খেজুরের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানির তীব্র উত্থান। ফলে সামগ্রিক আমদানির পরিমাণ দ্রুত বাড়লেও রপ্তানি আয় সেই তুলনায় ধীর গতিতে বাড়েছে বা স্থিতিশীল থেকেছে, ফলে ঘাটতি বড় হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যায়ে দেশের ব্যবসায়ীরা মোট প্রায় ৪,৬১৭ কোটি ডলার (প্রায় ৪৬.১৭ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের পণ্য আমদানি করেছেন, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫.৬ শতাংশ বেশি। এই সময়ের পণ্য রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৩০.০৩ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩,০০৩ কোটি ডলার), যা আগের বছরের ২৯.২৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ২.৬ শতাংশ বেশি। আমদানি ও রপ্তানির এই অনুকূলমানের ব্যবধান থেকেই পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে দেশে ব্যয়ে নিয়ন্ত্রণ না আনলে এবং রপ্তানি বহুগুণ বাড়াতে না পারলে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়বে। তারা সতর্ক করেন স্বল্পমেয়াদি ভোগ্যপণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ, ভ্যালু-অ্যাডেড রপ্তানি বাড়ানো ও বহুমুখী বাজার নির্ভরতা বাড়ানো এই বিষয়গুলো জরুরি।
ব্যালেন্স অব পেমেন্টের অন্যান্য সূচকেও মিশ্র চিত্র দেখা যায়। চলতি হিসাবে (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) সামান্য ঋণাত্মক অবস্থায় আছে; ফেব্রুয়ারির শেষে চলতি হিসাব ঘাটতি ছিল প্রায় ১০০ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ১৪৭ কোটি ডলারের তুলনায় কম। মোট সামগ্রিক লেনদেন (ওভারঅল ব্যালান্স) ভালো অবস্থায় রয়েছে; আলোচিত সময়ে ওভারঅল ব্যালান্স দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪৩ কোটি ডলার, যেখানে আগের বছর একই সময়ে এটি ঋণাত্মক ছিল প্রায় ১১৫ কোটি ডলার।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েছে — এই অর্থবছরের প্রথম আট মাসে প্রায় ২ হাজার ২৪৫ কোটি ডলার (প্রায় ২২.৪৫ বিলিয়ন ডলার) রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১.৪ শতাংশ বৃদ্ধি।
প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কিছুটা কমেছে; গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়কালীন এফডিআই ছিল প্রায় ১০৬ কোটি ডলার, চলতি সময়ে প্রাপ্তি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ কোটি ডলারে। অপরদিকে শেয়ারবাজারে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ নিট হিসেবে ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে — এ খাতে(net) প্রায় ৮ কোটি ডলার বেরিয়ে গেছে, যা আগের বছরও প্রায় সমপরিমাণ ঋণাত্মক ছিল।
সংক্ষেপে, রপ্তানি বাড়লেও আমদানির তীব্রতা এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মনেহয়, স্থায়ীভাবে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আমদানির দক্ষ নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি পণ্য বৈচিত্র্য ও নতুন বাজার অন্বেষণ অপরিহার্য।
-

লোকসানে ১৭ ব্যাংক; সিএসআর ব্যয় প্রায় অর্ধেকে নেমে গেল
২০২৪ সালে দেশের বেশ কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক আর্থিক চাপে পড়ার প্রভাব ২০২৫ সালের কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) ব্যয়েও পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের (জানুয়ারি–ডিসেম্বর) মধ্যে দেশের ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক সিএসআর খাতে মোট মাত্র ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছে—আগের বছরের তুলনায় এটি প্রায় ২৭০ কোটি ৯১ লাখ টাকা বা প্রায় ৪২ শতাংশ কম।
অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর সামাজিক বিনিয়োগ গত এক বছরে খাড়া অনুঘটকে পড়েছে। গত এক দশকে এটি সিএসআর খাতে সর্বনিম্ন ব্যয়; এর আগে ২০১৫ সালে সর্বনিম্ন ছিল ৫২৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এ বছর ২০১৫ সালের তুলনায় ব্যয় প্রায় ১৮২ কোটি টাকা বা ৩৪.৫৭ শতাংশ কমে গেছে।
বহু বছরের ধারাবাহিক রেকর্ড দেখালে দেখা যায় সিএসআর ব্যয় ধীরে ধীরে কমছে — ২০২২ সালে ছিল ১,১২৯ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে ৯২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা এবং ২০২৫ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৪ সালে ১৭টি ব্যাংক নিট মুনাফা অর্জন করতে পারেনি; যেসব ব্যাংক মুনাফা করেছে, তাদেরও আয় প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। এই আর্থিক দুর্বলতার ফলে সিএসআর বাজেট ছোট করা এবং ব্যয় পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন, ২০২৪ সালের জুন–জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, এরপর সরকার পরিবর্তনের প্রভাব এবং একই সময়ে কয়েকটি ব্যাংকের অনিয়ম ও অর্থ পাচারের তথ্যের বহুল প্রকাশ ব্যাংকিং সেক্টরে বড় ধাক্কা দিয়েছে। কাগজে-কলমে দেখানো মুনাফার বিপরীতে প্রকৃত আর্থিক চিত্র উন্মোচিত হওয়ায় খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকে এবং প্রকৃত লোকসান সামনে আসে। দুর্বল হলে পড়া কয়েকটি ব্যাংক সরকারি উদ্যোগে একীভূত করেও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করা হয়েছে।
ব্যাংকারদের কথায়, রাজনৈতিক চাপও আগে সিএসআর ব্যয়ে বাড়তি ভূমিকা রাখত—শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা ইভেন্টের জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুরোধে ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হত; অনেকে এমন ব্যয়কে সিএসআর হিসেবে দেখাতেই স্বচ্ছতার সমস্যা দেখা যেত। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি আন্দোলন এবং আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর সেই প্রথা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, ফলে এখন ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে কটা ব্যয় করবেন তা বেশি পরিমাপ করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সিএসআর খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক প্রভাব বা অনিয়মভিত্তিক ব্যয় সমাজকল্যাণের মূল উদ্দেশ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং জনফান্ডের অপচয় ঘটায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েছে, ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফার একটি অংশ সিএসআর খাতে ব্যয় করতে হবে এবং তা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ভাগ করে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে—শিক্ষায় ৩০ শতাংশ, স্বাস্থ্যখাতে ৩০ শতাংশ, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ২০ শতাংশ এবং বাকি ২০ শতাংশ অন্যান্য খাতে। বাস্তবে তবে এই অনুপাতে ব্যয় হচ্ছে না: ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি, ৩৬ শতাংশ, ‘অন্যান্য’ খাতে ব্যয় করেছে; শিক্ষায় ব্যয় হয়েছে ২৮.৫৩ শতাংশ এবং পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে মাত্র ১০ শতাংশ। স্বাস্থ্যখাতে তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য অংশ থাকলেও সরকারি নির্দেশনার কাঠামো অনুযায়ী সামঞ্জস্যের ঘাটতি স্পষ্ট।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আলোচিত সময়ে ১১টি ব্যাংক সিএসআর খাতে একটাও টাকা ব্যয় করেনি। সেই ব্যাংকগুলো হল— জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।
একই প্রতিবেদনে ২০২৪ সালে লোকসানে থাকা ব্যাংকগুলোর তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে; এতে জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান-এর নাম রয়েছে।
উল্লেখ্য, লোকসানে থাকা ছয়টি ব্যাংক সত্ত্বেও সিএসআর খাতে অর্থ বরাদ্দ করেছে—এবি ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।
সমগ্র পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, ব্যাংকিং খাতের আর্থিক সুরক্ষা ও সিএসআর নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সামাজিক বিনিয়োগে স্থায়ী বৃদ্ধি আশা করা কঠিন। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নির্ধারিত নীতিমালা মেনে ব্যয় নিশ্চিতে বিধি-কাঠামো শক্ত করা অপরিহার্য।
-

জিডিপির প্রবৃদ্ধি ফের নিম্নমুখী
চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার আবারও কমে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, অক্টোবর-ডিসেম্বরে জিডিপির বৃদ্ধি ছিল মাত্র ৩.০৩ শতাংশ, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৪.৯৬ শতাংশ। এর আগে, গত অর্থবছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ, এ দুই সময়ের তুলনায় বর্তমান প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি বেশ কম হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আন্তর্জাতিক বৈশ্বিক ঘটনার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটও দায়ী। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়, যার ফলে যুদ্ধের ঝুঁকি বেড়ে গেছে এবং গ্যাস, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। এই পরিস্থিতির জন্য বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে, যা বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য অশুভ সংকেত। এর প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাধা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি কমছে। বিবিএসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই সময়ে শিল্প খাতে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যেখানে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ১.২৭ শতাংশ। অন্যদিকে, কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি ৩.৬৮ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৪.৪৫ শতাংশ হয়েছে। এর আগে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল সর্বোচ্চ ৬.৮২ শতাংশ। তবে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে শিল্পের প্রবৃদ্ধির হার ধীরে ধীরে কমে আসছে। জানা যায়, জিডিপিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে শিল্প খাত, কিন্তু এর প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার কারণে সার্বিক পরিকল্পনা অনুযায়ী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তবে কৃষি ও সেবা খাতের উন্নয়ন এখনও অব্যাহত রয়েছে। মোটকথা, বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ভবিষ্যতে সতর্কবার্তা বয়ে আনছে।
-

২০২৪ সালে ব্যাংক খাতে লোকসান ও সিএসআরে বিশ্লেষণ: সংকটের চিত্র
২০২৪ সাল বাংলাদেশ ব্যাংকিং খাতের জন্য ছিল এক কঠিন ও চ্যালেঞ্জে ভরা সময়। বছরজুড়ে অর্থনৈতিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি এবং বিভিন্ন প্রভাবের কারণে দেশের বেশিরভাগ ব্যাংকই নিট মুনাফা অর্জনে পিছিয়ে পড়ে। এমনকি, বেশ কিছু ব্যাংকই পুরোপুরি লোকসানে চলে যায়। এর ফলে, ব্যয় কমের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে অর্ধেকেরও বেশি কমে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক সামগ্রিকভাবে চরম অর্থনৈতিক চাপে পড়ে সিএসআরের জন্য কেবল ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকার ব্যয় করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ২৭০ কোটি ৯১ লাখ টাকা বা ৪২ শতাংশ কম। এটি গত দশকে সর্বনিম্ন সিএসআর ব্যয়ের রেকর্ড। এর আগে, ২০১৫ সালে সর্বনিম্ন ব্যয় ছিল ৫২৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকার মতো। অর্থাৎ, এক দশকের মধ্যেই এই খাতে ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় অর্ধেকের বেশি কমে গেছে, যা একটি ভয়ঙ্কর নিম্নমুখী প্রবণতা নির্দেশ করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০২৪ সালে সিএসআর খাতে ব্যয় করা হয়েছে মোট ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৩০৮ কোটি টাকা বা ৩৩ শতাংশ কম। এর আগের বছর ২০২৩ সালে ব্যয় ছিল ৯২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা, এবং ২০২২ সালে ছিল ১,১২৯ কোটি টাকা। এই দুই বছরের মধ্যে মোট সিএসআর ব্যয়ের হার কমে গেছে প্রায় ৫১৩ কোটি টাকা বা ৪৫ শতাংশের বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে এই অর্থনৈতিক তুলনায় অবনতির প্রভাব ছিল সর্বোচ্চ। ছাত্র-জনতার আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, এবং পরবর্তী সরকারে পরিবর্তনের প্রভাবে ব্যাংকিং খাতে নানা ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি, বিভিন্ন ব্যাংকের মধ্যে অনিয়ম, লুটপাট, অর্থ পাচার ও খেলাপি ঋণের বিষয়গুলো প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। এর ফলে, ব্যাংকগুলোতে প্রকৃত আর্থিক পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়, যেখানে দেখানো মুনাফার বিপরীতে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলো বেশ কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে যায়, যেখানে কিছু শিল্পগোষ্ঠীর ঋণ অনিয়ম ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো বড় ধরনের চাপে পড়ে। এর ফলস্বরূপ, এসব দুর্বল ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের উদ্যোগে কিছু ব্যাংককে একীভবন বা মিউচুয়াল সমন্বয়ের পরিকল্পনা নেয়া হয়।
ব্যাংকাররা বলছেন, সিএসআর খাতে ব্যয়ের ইতিহাসে রাজনৈতিক পরিবর্তনও খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আগে রাজনৈতিক সরকারের সময় নানা ধাপে ও চাপে ব্যাংকগুলোকে উন্নয়নমূলক কাজে অপচয় বা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হতো। অনেক সময় এসব ব্যয় সরাসরি সিএসআর পরিকল্পনার আওতার বাইরে চলে যেত। তবে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন ও আগস্টের সরকার পরিবর্তনের পরে নানা ধরনের চাপ কমে গেছে এবং ব্যাংকগুলো এখন চিনাকী সিদ্ধান্তে ব্যয় করছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সিএসআর খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য, কারণ রাজনৈতিক প্রভাব ও চাপের কারণে অনেক সময়ে ব্যাংকগুচ্ছ অব্যবহারযোগ্য ও অপ্রয়োজনীয় খাতে অর্থ ব্যয় করে, যা মূল উদ্দেশ্য বা সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষতি করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো তাদের নিট মুনাফার একটি নির্দিষ্ট অংশকে সিএসআর খাতে ব্যয় করতে বাধ্য। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ শিক্ষা, ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্য, এবং ২০ শতাংশ পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যয়ের কথা বলা আছে। বাকি ২০ শতাংশ অন্যান্য সামাজিক কাজের জন্য বরাদ্দ করা যায়। কিন্তু বাস্তবে অনেক ব্যাংক নানা কারণে এই নির্দেশনা মানেনি। ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো মোট ব্যয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ ‘অন্য’ খাতে ব্যয় করেছে। শিক্ষায় ব্যয় হয়েছে মাত্র ২৮.৫৩ শতাংশ, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাতের জন্য সময় অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বরাদ্দ আসেনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায়, বছরজুড়ে মোট ১১টি ব্যাংক কোনো অর্থ সিএসআরে বরাদ্দ করেনি। এই ব্যাংকগুলো হলো- জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশের কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।
উপসংহারে, ২০২৪ সালে দেশের বেশিরভাগ ব্যাংকের লোকসভা, দুর্বলতা, ও সিএসআর ব্যয়ের ধারাবাহিক হ্রাস একদিকে সবকিছুকে এক ধরনের সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো সঠিক দিশা খুঁজে পাওয়া ও টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা করছে।
