Category: অর্থনীতি

  • ৮ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দুই লাখ কোটি টাকার ওপরে

    ৮ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দুই লাখ কোটি টাকার ওপরে

    চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম আট মাসে রপ্তানির তুলনায় আমদানির দ্রুত বৃদ্ধির কারণে দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি বৃদ্ধিপেতে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৯১ কোটি ডলারে — যা বাংলাদেশি টাকায় দুই লাখ সাত হাজার কোটি টাকারও বেশি। আগের অর্থবছরের একই সময়ের ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৩৭১ কোটি ডলার।

    বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ব্যালেন্স অব পেমেন্ট (বিওপি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই চিত্রটি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল কারণ হলো জ্বালানিসহ বেশিরভাগ পণ্যের বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং বিশেষ করে রমজানকে সামনে রেখে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল ও খেজুরের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানির তীব্র উত্থান। ফলে সামগ্রিক আমদানির পরিমাণ দ্রুত বাড়লেও রপ্তানি আয় সেই তুলনায় ধীর গতিতে বাড়েছে বা স্থিতিশীল থেকেছে, ফলে ঘাটতি বড় হয়েছে।

    পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যায়ে দেশের ব্যবসায়ীরা মোট প্রায় ৪,৬১৭ কোটি ডলার (প্রায় ৪৬.১৭ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের পণ্য আমদানি করেছেন, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫.৬ শতাংশ বেশি। এই সময়ের পণ্য রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৩০.০৩ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩,০০৩ কোটি ডলার), যা আগের বছরের ২৯.২৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ২.৬ শতাংশ বেশি। আমদানি ও রপ্তানির এই অনুকূলমানের ব্যবধান থেকেই পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি বেড়েছে।

    অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে দেশে ব্যয়ে নিয়ন্ত্রণ না আনলে এবং রপ্তানি বহুগুণ বাড়াতে না পারলে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়বে। তারা সতর্ক করেন স্বল্পমেয়াদি ভোগ্যপণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ, ভ্যালু-অ্যাডেড রপ্তানি বাড়ানো ও বহুমুখী বাজার নির্ভরতা বাড়ানো এই বিষয়গুলো জরুরি।

    ব্যালেন্স অব পেমেন্টের অন্যান্য সূচকেও মিশ্র চিত্র দেখা যায়। চলতি হিসাবে (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) সামান্য ঋণাত্মক অবস্থায় আছে; ফেব্রুয়ারির শেষে চলতি হিসাব ঘাটতি ছিল প্রায় ১০০ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ১৪৭ কোটি ডলারের তুলনায় কম। মোট সামগ্রিক লেনদেন (ওভারঅল ব্যালান্স) ভালো অবস্থায় রয়েছে; আলোচিত সময়ে ওভারঅল ব্যালান্স দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪৩ কোটি ডলার, যেখানে আগের বছর একই সময়ে এটি ঋণাত্মক ছিল প্রায় ১১৫ কোটি ডলার।

    প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েছে — এই অর্থবছরের প্রথম আট মাসে প্রায় ২ হাজার ২৪৫ কোটি ডলার (প্রায় ২২.৪৫ বিলিয়ন ডলার) রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১.৪ শতাংশ বৃদ্ধি।

    প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কিছুটা কমেছে; গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়কালীন এফডিআই ছিল প্রায় ১০৬ কোটি ডলার, চলতি সময়ে প্রাপ্তি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ কোটি ডলারে। অপরদিকে শেয়ারবাজারে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ নিট হিসেবে ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে — এ খাতে(net) প্রায় ৮ কোটি ডলার বেরিয়ে গেছে, যা আগের বছরও প্রায় সমপরিমাণ ঋণাত্মক ছিল।

    সংক্ষেপে, রপ্তানি বাড়লেও আমদানির তীব্রতা এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মনেহয়, স্থায়ীভাবে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আমদানির দক্ষ নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি পণ্য বৈচিত্র্য ও নতুন বাজার অন্বেষণ অপরিহার্য।

  • লোকসানে ১৭ ব্যাংক; সিএসআর ব্যয় প্রায় অর্ধেকে নেমে গেল

    লোকসানে ১৭ ব্যাংক; সিএসআর ব্যয় প্রায় অর্ধেকে নেমে গেল

    ২০২৪ সালে দেশের বেশ কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক আর্থিক চাপে পড়ার প্রভাব ২০২৫ সালের কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) ব্যয়েও পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের (জানুয়ারি–ডিসেম্বর) মধ্যে দেশের ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক সিএসআর খাতে মোট মাত্র ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছে—আগের বছরের তুলনায় এটি প্রায় ২৭০ কোটি ৯১ লাখ টাকা বা প্রায় ৪২ শতাংশ কম।

    অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর সামাজিক বিনিয়োগ গত এক বছরে খাড়া অনুঘটকে পড়েছে। গত এক দশকে এটি সিএসআর খাতে সর্বনিম্ন ব্যয়; এর আগে ২০১৫ সালে সর্বনিম্ন ছিল ৫২৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এ বছর ২০১৫ সালের তুলনায় ব্যয় প্রায় ১৮২ কোটি টাকা বা ৩৪.৫৭ শতাংশ কমে গেছে।

    বহু বছরের ধারাবাহিক রেকর্ড দেখালে দেখা যায় সিএসআর ব্যয় ধীরে ধীরে কমছে — ২০২২ সালে ছিল ১,১২৯ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে ৯২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা এবং ২০২৫ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকায়।

    বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৪ সালে ১৭টি ব্যাংক নিট মুনাফা অর্জন করতে পারেনি; যেসব ব্যাংক মুনাফা করেছে, তাদেরও আয় প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। এই আর্থিক দুর্বলতার ফলে সিএসআর বাজেট ছোট করা এবং ব্যয় পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে।

    খাত সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন, ২০২৪ সালের জুন–জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, এরপর সরকার পরিবর্তনের প্রভাব এবং একই সময়ে কয়েকটি ব্যাংকের অনিয়ম ও অর্থ পাচারের তথ্যের বহুল প্রকাশ ব্যাংকিং সেক্টরে বড় ধাক্কা দিয়েছে। কাগজে-কলমে দেখানো মুনাফার বিপরীতে প্রকৃত আর্থিক চিত্র উন্মোচিত হওয়ায় খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকে এবং প্রকৃত লোকসান সামনে আসে। দুর্বল হলে পড়া কয়েকটি ব্যাংক সরকারি উদ্যোগে একীভূত করেও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করা হয়েছে।

    ব্যাংকারদের কথায়, রাজনৈতিক চাপও আগে সিএসআর ব্যয়ে বাড়তি ভূমিকা রাখত—শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা ইভেন্টের জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুরোধে ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হত; অনেকে এমন ব্যয়কে সিএসআর হিসেবে দেখাতেই স্বচ্ছতার সমস্যা দেখা যেত। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি আন্দোলন এবং আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর সেই প্রথা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, ফলে এখন ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে কটা ব্যয় করবেন তা বেশি পরিমাপ করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

    অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সিএসআর খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক প্রভাব বা অনিয়মভিত্তিক ব্যয় সমাজকল্যাণের মূল উদ্দেশ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং জনফান্ডের অপচয় ঘটায়।

    বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েছে, ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফার একটি অংশ সিএসআর খাতে ব্যয় করতে হবে এবং তা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ভাগ করে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে—শিক্ষায় ৩০ শতাংশ, স্বাস্থ্যখাতে ৩০ শতাংশ, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ২০ শতাংশ এবং বাকি ২০ শতাংশ অন্যান্য খাতে। বাস্তবে তবে এই অনুপাতে ব্যয় হচ্ছে না: ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি, ৩৬ শতাংশ, ‘অন্যান্য’ খাতে ব্যয় করেছে; শিক্ষায় ব্যয় হয়েছে ২৮.৫৩ শতাংশ এবং পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে মাত্র ১০ শতাংশ। স্বাস্থ্যখাতে তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য অংশ থাকলেও সরকারি নির্দেশনার কাঠামো অনুযায়ী সামঞ্জস্যের ঘাটতি স্পষ্ট।

    প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আলোচিত সময়ে ১১টি ব্যাংক সিএসআর খাতে একটাও টাকা ব্যয় করেনি। সেই ব্যাংকগুলো হল— জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।

    একই প্রতিবেদনে ২০২৪ সালে লোকসানে থাকা ব্যাংকগুলোর তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে; এতে জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান-এর নাম রয়েছে।

    উল্লেখ্য, লোকসানে থাকা ছয়টি ব্যাংক সত্ত্বেও সিএসআর খাতে অর্থ বরাদ্দ করেছে—এবি ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।

    সমগ্র পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, ব্যাংকিং খাতের আর্থিক সুরক্ষা ও সিএসআর নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সামাজিক বিনিয়োগে স্থায়ী বৃদ্ধি আশা করা কঠিন। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নির্ধারিত নীতিমালা মেনে ব্যয় নিশ্চিতে বিধি-কাঠামো শক্ত করা অপরিহার্য।

  • জিডিপির প্রবৃদ্ধি ফের নিম্নমুখী

    জিডিপির প্রবৃদ্ধি ফের নিম্নমুখী

    চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার আবারও কমে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, অক্টোবর-ডিসেম্বরে জিডিপির বৃদ্ধি ছিল মাত্র ৩.০৩ শতাংশ, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৪.৯৬ শতাংশ। এর আগে, গত অর্থবছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ, এ দুই সময়ের তুলনায় বর্তমান প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি বেশ কম হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আন্তর্জাতিক বৈশ্বিক ঘটনার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটও দায়ী। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়, যার ফলে যুদ্ধের ঝুঁকি বেড়ে গেছে এবং গ্যাস, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। এই পরিস্থিতির জন্য বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে, যা বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য অশুভ সংকেত। এর প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাধা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি কমছে। বিবিএসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই সময়ে শিল্প খাতে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যেখানে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ১.২৭ শতাংশ। অন্যদিকে, কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি ৩.৬৮ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৪.৪৫ শতাংশ হয়েছে। এর আগে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল সর্বোচ্চ ৬.৮২ শতাংশ। তবে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে শিল্পের প্রবৃদ্ধির হার ধীরে ধীরে কমে আসছে। জানা যায়, জিডিপিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে শিল্প খাত, কিন্তু এর প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার কারণে সার্বিক পরিকল্পনা অনুযায়ী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তবে কৃষি ও সেবা খাতের উন্নয়ন এখনও অব্যাহত রয়েছে। মোটকথা, বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ভবিষ্যতে সতর্কবার্তা বয়ে আনছে।

  • ২০২৪ সালে ব্যাংক খাতে লোকসান ও সিএসআরে বিশ্লেষণ: সংকটের চিত্র

    ২০২৪ সালে ব্যাংক খাতে লোকসান ও সিএসআরে বিশ্লেষণ: সংকটের চিত্র

    ২০২৪ সাল বাংলাদেশ ব্যাংকিং খাতের জন্য ছিল এক কঠিন ও চ্যালেঞ্জে ভরা সময়। বছরজুড়ে অর্থনৈতিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি এবং বিভিন্ন প্রভাবের কারণে দেশের বেশিরভাগ ব্যাংকই নিট মুনাফা অর্জনে পিছিয়ে পড়ে। এমনকি, বেশ কিছু ব্যাংকই পুরোপুরি লোকসানে চলে যায়। এর ফলে, ব্যয় কমের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে অর্ধেকেরও বেশি কমে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

    প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক সামগ্রিকভাবে চরম অর্থনৈতিক চাপে পড়ে সিএসআরের জন্য কেবল ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকার ব্যয় করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ২৭০ কোটি ৯১ লাখ টাকা বা ৪২ শতাংশ কম। এটি গত দশকে সর্বনিম্ন সিএসআর ব্যয়ের রেকর্ড। এর আগে, ২০১৫ সালে সর্বনিম্ন ব্যয় ছিল ৫২৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকার মতো। অর্থাৎ, এক দশকের মধ্যেই এই খাতে ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় অর্ধেকের বেশি কমে গেছে, যা একটি ভয়ঙ্কর নিম্নমুখী প্রবণতা নির্দেশ করছে।

    কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০২৪ সালে সিএসআর খাতে ব্যয় করা হয়েছে মোট ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৩০৮ কোটি টাকা বা ৩৩ শতাংশ কম। এর আগের বছর ২০২৩ সালে ব্যয় ছিল ৯২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা, এবং ২০২২ সালে ছিল ১,১২৯ কোটি টাকা। এই দুই বছরের মধ্যে মোট সিএসআর ব্যয়ের হার কমে গেছে প্রায় ৫১৩ কোটি টাকা বা ৪৫ শতাংশের বেশি।

    বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে এই অর্থনৈতিক তুলনায় অবনতির প্রভাব ছিল সর্বোচ্চ। ছাত্র-জনতার আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, এবং পরবর্তী সরকারে পরিবর্তনের প্রভাবে ব্যাংকিং খাতে নানা ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি, বিভিন্ন ব্যাংকের মধ্যে অনিয়ম, লুটপাট, অর্থ পাচার ও খেলাপি ঋণের বিষয়গুলো প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। এর ফলে, ব্যাংকগুলোতে প্রকৃত আর্থিক পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়, যেখানে দেখানো মুনাফার বিপরীতে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলো বেশ কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে যায়, যেখানে কিছু শিল্পগোষ্ঠীর ঋণ অনিয়ম ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো বড় ধরনের চাপে পড়ে। এর ফলস্বরূপ, এসব দুর্বল ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের উদ্যোগে কিছু ব্যাংককে একীভবন বা মিউচুয়াল সমন্বয়ের পরিকল্পনা নেয়া হয়।

    ব্যাংকাররা বলছেন, সিএসআর খাতে ব্যয়ের ইতিহাসে রাজনৈতিক পরিবর্তনও খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আগে রাজনৈতিক সরকারের সময় নানা ধাপে ও চাপে ব্যাংকগুলোকে উন্নয়নমূলক কাজে অপচয় বা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হতো। অনেক সময় এসব ব্যয় সরাসরি সিএসআর পরিকল্পনার আওতার বাইরে চলে যেত। তবে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন ও আগস্টের সরকার পরিবর্তনের পরে নানা ধরনের চাপ কমে গেছে এবং ব্যাংকগুলো এখন চিনাকী সিদ্ধান্তে ব্যয় করছে।

    অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সিএসআর খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য, কারণ রাজনৈতিক প্রভাব ও চাপের কারণে অনেক সময়ে ব্যাংকগুচ্ছ অব্যবহারযোগ্য ও অপ্রয়োজনীয় খাতে অর্থ ব্যয় করে, যা মূল উদ্দেশ্য বা সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষতি করে।

    বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো তাদের নিট মুনাফার একটি নির্দিষ্ট অংশকে সিএসআর খাতে ব্যয় করতে বাধ্য। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ শিক্ষা, ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্য, এবং ২০ শতাংশ পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যয়ের কথা বলা আছে। বাকি ২০ শতাংশ অন্যান্য সামাজিক কাজের জন্য বরাদ্দ করা যায়। কিন্তু বাস্তবে অনেক ব্যাংক নানা কারণে এই নির্দেশনা মানেনি। ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো মোট ব্যয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ ‘অন্য’ খাতে ব্যয় করেছে। শিক্ষায় ব্যয় হয়েছে মাত্র ২৮.৫৩ শতাংশ, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাতের জন্য সময় অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বরাদ্দ আসেনি।

    প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায়, বছরজুড়ে মোট ১১টি ব্যাংক কোনো অর্থ সিএসআরে বরাদ্দ করেনি। এই ব্যাংকগুলো হলো- জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশের কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।

    উপসংহারে, ২০২৪ সালে দেশের বেশিরভাগ ব্যাংকের লোকসভা, দুর্বলতা, ও সিএসআর ব্যয়ের ধারাবাহিক হ্রাস একদিকে সবকিছুকে এক ধরনের সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো সঠিক দিশা খুঁজে পাওয়া ও টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা করছে।

  • ৮ মাসে বাংলাদেশের বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি দুই লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাল

    ৮ মাসে বাংলাদেশের বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি দুই লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাল

    চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে বাংলাদেশে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭০৩ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা। এই পরিমাণ প্রায় দুই গুণ বেশি গত অর্থবছরের একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতির তুলনায়, যেখানে ছিল ১ হাজার ৩৭১ কোটি ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেনের সাম্প্রতিক রিপোর্টে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

    বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফেব্রুয়ারি মাসে রমজান ও তার আশেপাশে সময়ের কারণে ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, ছোলা ও খেজুরসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি, একই সময়ের মধ্যে রপ্তানি আয় অপ্রত্যাশিতভাবে কমে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতিতে আরও বাড়তি চাপ পড়ে। এর ফলস্বরূপ, দেশের অর্থনীতি যতদিন পর্যন্ত আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি বৃদ্ধি করতে না পারবে, ততদিন এই সমস্যা আরও জটিল হতে পারে।

    সরকারি হিসাব বলছে, জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ের মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মোট ৪৬১৭ কোটি ডলার পণ্য আমদানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪৩৭৪ কোটি ডলার। অন্যদিকে, এই সময়ের মধ্যে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৩০০৬ কোটি ডলার, যেখানে গত বছর এই পরিমাণ ছিল ২৯০৬ কোটি ডলার। এ কারণে আমদানি-রপ্তানি ব্যবধান বেড়ে চলেছে, আর সেই কারণেই প্রথম ৮ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি আরও বৃদ্ধি পায়।

    অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, দেশের অর্থনীতি টেকসই রাখতে হলে আমদানি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রপ্তানি বাড়াতে হবে। অন্যথায়, চলমান চাপের মধ্য থেকে出口ে অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি সামান্য হলেও রয়েছে, যা ফেব্রুয়ারি শেষে দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি ডলার। আগের বছরের একই সময়ে সেই ঘাটতি ছিল ১৪৭ কোটি ডলার। খেয়াল করলে দেখা যাবে, সামগ্রিক লেনদেনের (ওভারঅল ব্যালেন্স) অবস্থা ইতিবাচকভাবে উন্নতি হচ্ছে, এই সময়ে তা ৩৪৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ঋণাত্মক ১১৫ কোটি ডলার।

    প্রবাসীরা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন, তাদের পাঠানো রেমিটেন্স এই সময়ে ২ হাজার ২৪৫ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।

    অন্যদিকে, দেশের বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) উজ্জীবিত হলেও, শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ কমে গেছে। গত বছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ১০৬ কোটি ডলার, চলতি অর্থবছরে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭ কোটি ডলারে। এই সংকটজনক পরিস্থিতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগের পোর্টফোলিও ধারায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যেখানে প্রথম ৮ মাসে নিট বিনিয়োগ কমেছে ৮ কোটি ডলার।

  • যদি যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতির হার ১২% ছাড়াতে পারে

    যদি যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতির হার ১২% ছাড়াতে পারে

    মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমবে এবং জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। এসব কারণে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের মূল্যস্ফীতির হার এখনকার ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। পাশাপাশি, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে, কারণ আমদানির চাহিদা বেড়ে গেলে রিজার্ভের ব্যবহারে বৃদ্ধি হবে। বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আনুমানিক ৩১.১২ বিলিয়ন ডলার থেকে কিছুটা কমে ২৪.২৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২,৪২৪ কোটি ডলারে নেমে আসতে পারে বলে প্রাথমিক ধারণা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

    প্রসঙ্গত, যদি যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এই বছর প্রথম প্রান্তিকে ৭০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে অন্তত ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তবে দেশের বাজারে দাম সামঞ্জস্য করতে হবে। এছাড়া, ডলারের বিপরীতে টাকার মান যদি ধীরে ধীরে হারায়—প্রথমত ৫ শতাংশ এবং পরে আরও ৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়—তাহলে ডিসেম্বরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার ১১.৬৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এই সময়ের জন্য মূল্যস্ফীতির ভিত্তি ধরা হয়েছে ৯.৫৬ শতাংশ। একই সময়ের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে ৩ হাজার ২৭২ কোটি ডলার।

    এছাড়া, যদি চলতি বছর প্রথম প্রান্তিকে ডলারের বিপরীতে টাকার মান ৫ শতাংশ অবমূল্যায়িত হয় এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে আরও ১০ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়, তাহলেও জ্বালানি তেলের অপ্রত্যাশিত মূল্যবৃদ্ধি হলে দেশের মূল্যস্ফীতির হার আরও বেশি বাড়তে পারে, যা কিনা ১২.২৮ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এর পাশাপাশি, রিজার্ভের পরিমাণ কমে যেতে পারে উল্লেখিত সময়ের মধ্যে ২ হাজার ৪২৪ কোটি ডলার পর্যন্ত।

    প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সব হিসাবই বিভিন্ন অনুমান ও ধারণার ভিত্তিতে প্রস্তুত, যেখানে জ্বালানি তেল ও ডলারের দামে বড় ধরনের অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন না হলে, ডিসেম্বরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার ১০ শতাংশের বেশি হবে না। তবে, যদি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ে, তাহলে আমদানি খরচ বাড়বে এবং রিজার্ভে চাপ বাড়বে। এ পরিস্থিতিতে, সরকার যদি অভ্যন্তরীণভাবে রাজস্ব বাড়ায় ও জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখে, তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

    প্রতিবেদনটি আরও উল্লেখ করে, যদি জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বেশি বাড়ে ও ডলারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তবে এটি দেশের মুদ্রাবাজারে দুর্বলতা সৃষ্টি করবে। মুদ্রার বিনিময় হার দুর্বল হয়ে গেলে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন পড়বে, যার ফলে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হতে পারে। এর ফলে রিজার্ভ দ্রুত কমবে, এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন হতে পারে।

    এই পরিস্থিতি এড়াতে, রিজার্ভের চাপ কমাতে ও ডলারের সরবরাহ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিনিময় হার কিছুটা নমনীয় করতে পারে বা ডলারের দাম কিছুটা বাড়ানোরও প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে, দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সামঞ্জস্য রাখতে হতে পারে, অন্যথায় মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাবার আশঙ্কা রয়েছে।

    সব মিলিয়ে, দেখা যাচ্ছে যে তেলের দাম বৃদ্ধির সাথে ডলার অবমূল্যায়নের প্রভাব সরাসরি দেশের মূল্যস্ফীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে, যা ভোক্তার জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি মোটের ওপর দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

  • সোনার দাম আবার বেড়েছে, ভরিতে আড়াই লাখের বেশি মূল্য

    সোনার দাম আবার বেড়েছে, ভরিতে আড়াই লাখের বেশি মূল্য

    দেশের বাজারে আবারও বেড়েছে সোনার দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার পর আজ থেকেই নতুন দাম কার্যকর হচ্ছে। জনপ্রিয় ২২ ক্যারেটের সোনার ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) এখন নির্ধারিত হয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার ৪০৯ টাকা, যা পূর্বের দাম থেকে সাড়ে ৬ হাজার ৫৯০ টাকা বেশি। এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বুধবার (৮ এপ্রিল) সকালে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার (পিওর গোল্ড) দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এই নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, অন্যান্য ক্যারেটের সোনার দামও বেড়েছে। ২১ ক্যারেটের ভরি হবে ২ লাখ ৪০ হাজার ৯২০ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ৬ হাজার ৫১১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনার দাম দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ১৯৫ টাকায়। আরও গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো, রুপার দামও বাড়ছে। ভরিতে ৩৫০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের রুপার দাম নির্ধারিত হয়েছে ৫ হাজার ৮৯০ টাকা। একইভাবে, ২১ ক্যারেটের রুপা ভরি হবে ৫ হাজার ৫৯৯ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ৪ হাজার ৭৮২ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার মূল্য নির্ধারিত হয়েছে ৩ হাজার ৬১৬ টাকায়। এই দাম বৃদ্ধির ফলে বাজারে সোনার ও রুপার বিক্রেতাদের জন্য নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি হয়েছে, যা ক্রেতাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

  • ১৭ ব্যাংক লোকসানে, সিএসআর ব্যয় প্রায় অর্ধে নেমে গেল

    ১৭ ব্যাংক লোকসানে, সিএসআর ব্যয় প্রায় অর্ধে নেমে গেল

    ২০২৪ সালে বাজে আর্থিক অবস্থার দাপটে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সংকট গভীর হলো—সেই বছর ১৭টি ব্যাংক নিট মুনাফা করতে ব্যর্থ হয়। সেই আর্থিক ধাক্কায় পরবর্তীতে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যয়ও নাটকীয়ভাবে কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর সংক্রান্ত প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের (জানুয়ারি–ডিসেম্বর) ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মোট সিএসআর ব্যয় দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ২৭০ কোটি ৯১ লাখ টাকা—প্রায় ৪২ শতাংশ—কম।

    এটি গত এক দশকের মধ্যে সিএসআর খাতে সবচেয়ে নিম্নস্তরের ব্যয়। আগের নিম্নতম রেকর্ড ছিল ২০১৫ সালে, তখন খরচ ছিল ৫২৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা; তুলনায় এবারের ব্যয় প্রায় ১৮২ কোটি টাকা কম হয়েছে (৩৪.৫৭ শতাংশ)।

    কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সিএসআর খাতে খরচ হয়েছিল ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের ৯২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকার তুলনায় ৩০৮ কোটি টাকা বা প্রায় ৩৩ শতাংশ কম। ২০২২ সালে সিএসআর ব্যয় ছিল ১,১২৯ কোটি টাকা—অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে খরচ প্রায় ৫১৩ কোটি টাকা বা ৪৫ শতাংশেরও বেশি কমেছে।

    খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরবর্তী সরকার পরিবর্তন ব্যাংকিং খাতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকের অনিয়ম, লুটপাট ও অর্থপাচারের তথ্য প্রকাশ পেলে কাগজে-কলমে দেখানো মুনাফা আর বাস্তব আর্থিক চিত্রের মধ্যে ফাঁক উন্মোচিত হয়। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ায় প্রকৃত লোকসান প্রকাশ্যে আসে এবং বিশেষ করে শরিয়াভিত্তিক কয়েকটি ব্যাংক বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে। সরকারি হস্তক্ষেপে দুর্বল ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতা ফেরাতে একাধিক ব্যাঙ্ক একীভূত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

    ব্যাংকারদের বক্তব্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনও সিএসআর ব্যয় কমার একটি বড় কারণ। রাজনৈতিক সরকারের সময়ে বিভিন্ন পর্যায় থেকে অনুদান ও সহযোগিতার জন্য চাপ থাকায় ব্যাংকগুলো অনেক সময় উচ্চ মাত্রায় খরচ করত; এমনকি প্রায়শই সেগুলো সিএসআর-এর পরিধির বাইরে চলে যেত। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের আন্দোলন ও সরকারের বদলের পর সেই চাপ অনেকটাই কমে যাওয়ায় ব্যাংক এখন তুলনামূলকভাবে বিচারে সিএসআর ব্যয় করছে।

    অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেন, সিএসআর ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জরুরি। রাজনৈতিক চাপ বা অনিয়মের কারণে অর্থ অনুৎপাদনশীল প্রকল্পে চলে গেলে সামাজিক দায়বদ্ধতার মৌলিক উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

    বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে—ব্যাংকগুলোকে তাদের নিট মুনাফার একটি অংশ সিএসআর খাতে ব্যয় করতে হবে; তা-ই নির্দেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে যথাক্রমে ৩০ শতাংশ করে, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ২০ শতাংশ এবং বাকিটা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে নির্দেশনার সঙ্গে মিল নেই। ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি—৩৬ শতাংশ—ব্যয় করেছে ‘অন্যান্য’ খাতে। শিক্ষায় গিয়েছে ২৮.৫৩ শতাংশ, স্বাস্থ্য খাতে জমেছে উল্লেখযোগ্য অংশ, আর পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে মাত্র ১০ শতাংশ বরাদ্দ হয়েছে।

    প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আলোচিত সময়ে ১১টি ব্যাংক সিএসআর খাতে একটিও টাকা খরচ করেনি। ওই ব্যাংকগুলো হলো: জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।

    এছাড়া ২০২৪ সালে লোকসানে থাকা ব্যাংকগুলোর তালিকায় রয়েছে জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।

    উল্লেখ্য, এই লোকসান মোকাবিলার সময়েও ছয়টি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক সিএসআর খাতে টাকা দিয়েছে—এগুলো হল এবি ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।

    সারমর্মে, আর্থিক চাপ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রকাশিত অনিয়ম মিলিয়ে ব্যাংকখাতের সিএসআর ব্যয় গত কয়েক বছরে দ্রুতভাবে কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাতে সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রম পিছিয়ে না পড়ে, তার জন্য সিএসআর-র পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও লক্ষ্যভিত্তিক বরাদ্দ জরুরি।

  • জুলাই–ফেব্রুয়ারিতে বাণিজ্য ঘাটতি ১,৬৯১ কোটি ডলার—প্রায় ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা

    জুলাই–ফেব্রুয়ারিতে বাণিজ্য ঘাটতি ১,৬৯১ কোটি ডলার—প্রায় ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা

    বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছর (২০২৫–২৬) জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম আট মাসে দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১,৬৯১ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ পরিমাণ আগের অর্থবছরের একই সময়ে থাকা ১,৩৭১ কোটি ডলারের তুলনায় বাড়।

    রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ওই সময়ের আমদানি ছিল ৪ হাজার ৬১৭ কোটি ডলার (প্রায় ৪৬.১৪ বিলিয়ন ডলার), যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে পণ্য রপ্তানি আয় হয়েছে ৩০.০৩ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি বা পরিবর্তনের সীমা তুলনায় কম থাকায় আমদানির তুলনায় রপ্তানি বাড়তি চাপ সামাল দিতে পারেনি। আমদানি বৃদ্ধি এবং রপ্তানির ধীরগতির সমন্বয়ে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার প্রধান কারণগুলো রপ্তানি-খাত সংশ্লিষ্টরা এবং অর্থনীতিবিদরা হিসেবে দেখাচ্ছেন।

    অর্থনীতিবিদরা বলেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রমজানকে সামনে রেখে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল, খেজুরসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বাড়ার ফলে সামগ্রিক আমদানির পরিমাণ বেড়ে গেছে। একই সময় রফতানিতে প্রয়োজনীয় গতি না থাকায় আয়ের ফারাক আরও বেড়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে আমদারি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রপ্তানি বাড়ানো প্রয়োজন; তা না হলে বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

    চলতি হিসাব ও মোট ব্যালান্স:

    বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবরণী অনুযায়ী, কারেন্ট অ্যাকাউন্টে (চলতি হিসাব) সামান্য ঋণাত্মক অবস্থান রয়েছে। চলতি অর্থবছরে ফেব্রুয়ারির শেষে কারেন্ট অ্যাকাউন্টের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০০ কোটি ডলার, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ঘাটতি ছিল ১৪৭ কোটি ডলার। অন্যদিকে সামগ্রিক ব্যালান্স (ওভারঅল ব্যালান্স) ইতিবাচক আছে—আলোচিত সময়ে সামগ্রিক লেনদেনের উদ্বৃত্ত ৩৪৩ কোটি ডলার এসেছে; আগের বছরের একই সময়ে এটি ঋণাত্মক ১১৫ কোটি ডলার ছিল। এই উদ্বৃত্ত অর্থাৎ সামগ্রিক ব্যালান্সে ইতিবাচকতা সরকারের বৈদেশিক দেনা-ভারি কমাতে সহায়ক বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।

    রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বিনিয়োগ:

    প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, উল্লেখিত আট মাসে প্রবাসী কর্মীরা মোট ২,২৪৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ের ১,৮৮৭ কোটি ডলারের তুলনায় প্রায় ২১.৪ শতাংশ বেড়েছে।

    প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) গত অর্থবছরের জুলাই–ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১০৬ কোটি ডলার; চলতি বছর একই সময় এফডিআই এসেছে ৮৭ কোটি ডলার—অর্থাৎ কিছুটা কমেছে। শেয়ারবাজারে পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্টের দিক থেকে বিদেশি নিট অবস্থান আলোচিত সময়ে নেতিবাচক ছিল; শেয়ারবাজারে নিট বৈদেশিক বিনিয়োগ হিসেবে প্রায় ৮ কোটি ডলার নেয়া গেছে, যা আগের বছরের সেই সময়ের সমান ঘাটতির কাছাকাছি।

    সমাপ্তি:

    বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে আমদানির চাপ বাড়ায় ঘাটতির জায়গা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে অনুরূপ ঝুঁকি মোকাবিলায় আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি বৃদ্ধি—দুই দিকেই জোর দেওয়ার পরামর্শ অর্থনীতিবিদদের। দ্রুতগতিতে বৈদেশিক ভাণ্ডার শক্ত করতে নীতি প্রণেতাদের সময়মতো এবং সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

  • ৮ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ছাড়ালো ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা

    ৮ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ছাড়ালো ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা

    চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম আট মাসে রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি থাকায় দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি) রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই সময়ের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি এক হাজার ৬৯১ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা বাংলাদেশি টাকায় দুই লাখ সাত হাজার কোটি টাকার বেশি। গত অর্থবছরের একই সময় এই ঘাটতি ছিল এক হাজার ৩৭১ কোটি ডলার।

    রপ্তানি কমা ও আমদানির বাড়তি চাপই প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও বহু পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকায় আমদানির খরচ বেড়েছে। এছাড়া বর্তমানে ফেব্রুয়ারি মাসে রমজানকে কেন্দ্র করে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল ও খেজুরের মতো নিত্যপণ্যের আমদানি বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক আমদানিও হাঁকেছে। একদিকে আমদানির চাপ বাড়লেও রপ্তানি আয় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কমে গেলে বাণিজ্য ঘাটতি তীব্র হয়।

    ব্যাংকের তথ্যে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই–ফেব্রুয়ারি সময়ে দেশে পণ্যের আমদানি হয়েছে ৪ হাজার ৬১৭ কোটি ডলার (৪৬.১৪ বিলিয়ন ডলার), যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫.৬ শতাংশ বেশি। একই সময় পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩০.০৩ বিলিয়ন ডলার। আমদানি ও রপ্তানির এই ব্যবধানেই চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার প্রধান কারণ দেখা গেছে।

    খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে আমদানি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রপ্তানি বাড়াতে হবে। তিনি না হলে মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা উভয় ক্ষেত্রেই চাপ বাড়বে এবং অর্থনীতিকে জটিল পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে।

    চলতি হিসাব (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) সম্পর্কে রিপোর্টে বলা হয়েছে, দেশ এখন সামান্য ঋণাত্মক অবস্থায় আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ফেব্রুয়ারি শেষে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি ডলার, যেটি আগের বছর একই সময়ে ছিল ১৪৭ কোটি ডলার।

    অন্য সূচকে সামগ্রিক লেনদেন বা ওভারঅল ব্যালান্স ভালো অবস্থায় আছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আলোচিত সময়ে সামগ্রিক লেনদেনের অবস্থান বেড়ে ৩৪৩ কোটি ডলার হয়েছে; যেখানে আগের বছরের একই সময়ে এটি ঋণাত্মক করে ১১৫ কোটি ডলার ছিল।

    রেমিট্যান্স ও বিনিয়োগের দিকে গেলে, অর্থবছরের প্রথম আট মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা মোট ২ হাজার ২৪৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় শতকরা প্রায় ২১.৪ শতাংশ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

    প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কিছুটা কমেছে। গত অর্থবছরের জুলাই–ফেব্রুয়ারি সময়ে এটি ছিল ১০৬ কোটি ডলার, আর চলতি অর্থবছরে তা নামিয়ে এসেছে ৮৭ কোটি ডলারে। তবে শেয়ারবাজারে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ নেগেটিভ অবস্থায় রয়েছে; প্রথম আট মাসে নিটভাবে বিদেশি বিনিয়োগে ৮ কোটি ডলার বেরিয়ে গেছে, যা আগের বছরের অনুরূপ অবস্থার সঙ্গে মিলে যায়।

    সংক্ষেপে, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও দেশজ আমদানির বাড়তি চাহিদা মিলিত হয়ে চলতি অর্থবছরের আট মাসে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এখন আমদানি নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের দিকে ফলপ্রসূ নীতি নেওয়া জরুরি।