মধ্যপ্রদেশের ধার জেলায় বির্তকিত ভোজশালাকে (Bhojshala) হাইকোর্টই সরস্বতী বা বাগদেবীর মন্দির হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইন্দোর বেঞ্চ শুক্রবার যেটি ঘোষণা করেছে, সেই নির্দেশ অনুযায়ী ওই স্থানটিতে কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ই পূজা-অর্চনা করতে পারবেন; মুসলিম সম্প্রদায়ের নিয়মিত নামাজ আদায়ের অধিকার আর বহাল থাকবে না।
এই রায়ে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ—বিচারপতি বিজয়কুমার শুক্ল ও বিচারপতি অলোক অবস্থি—পাঁচটি আবেদন ও তিনটি ইন্টারভেনশনের শুনানি শেষে ভোজশালা সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি করেছেন। আদালত জানিয়েছে যে তার সিদ্ধান্ত বানান করতে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণ বিভাগ (এএসআই) কর্তৃক করা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা, ঐতিহাসিক দলিল ও প্রাসঙ্গিক নীতিনির্ধারণমূলক সিদ্ধান্ত (আযোধ্যা মামলার মতো) বিবেচনা করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী ভবনের প্রশাসন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এএসআই-র কাছেই থাকবে এবং ১৯৫৮-এর বিধান অনুযায়ী এএসআই সম্পত্তিটি পরিচালনা করবে।
আদালত উল্লেখ করেছে, ভোজশালা চত্বর ও বিতর্কিত এলাকা ‘‘ভোজশালা ও দেবী সরস্বতীর মন্দির’’ হিসেবে ধর্মীয় মর্যাদা বহন করে। পাশাপাশি রায় প্রকাশ করে আদালত বলেছেন, তীর্থযাত্রীদের মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দেবীর পবিত্রতা রক্ষা করা তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছে: যদি মুসলিম সম্প্রদায় নতুন মসজিদ নির্মাণের জন্য অন্য কোনও জমি বরাদ্দের আবেদন করে, রাজ্য সরকার সেই আবেদন যথার্থভাবে বিবেচনা করবে এবং আইন অনুযায়ী উপযুক্ত জমি বরাদ্দ করার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে।
পশ্চাতে থাকা ইতিহাস ও বিতর্ক: হিন্দু পক্ষের দাবি—রাজা ভোজের (১০১০–১০৫৫) সময়ে এখানে সরস্বতী মন্দির ও সংস্কৃত শিক্ষার কেন্দ্র ছিল। মুসলিম পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে এটিকে কামাল মওলা দরগা ও মসজিদ হিসেবেই মান্য করে আসছে। এএসআই জানিয়েছিল চতুর্দশ শতকে সুফি সাধক কামালউদ্দিনের সমাধির ওপরই পরে একটি মসজিদ গড়ে ওঠে বলে চিহ্ন পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে আদালতের নির্দেশে এএসআই ৯৮ দিন ধরে ভোজশালা কমপ্লেক্সের বৈজ্ঞানিক জরিপ করেছে।
গতকাল পর্যন্ত প্রথা ছিল—প্রশাসনের ব্যাবস্থায় মঙ্গলবার হিন্দু সম্প্রদায়কে পূজার অনুমতি থাকত এবং শুক্রবার মুসলিম সম্প্রদায় নামাজ আদায় করত; বসন্ত পঞ্চমীর উৎসবের জন্যও বিশেষ অনুমতি থাকত। নতুন রায়ের ফলে ওই পুরনো নিয়মে বড় পরিবর্তন এসেছে: নামাজের অনুমতি বাতিল হওয়ায় মুসলিম সম্প্রদায়ের সামনে বিকল্প জমির দাবি ও বৈধ তালিকাভুক্তি সংক্রান্ত একটি উপায় রেখে দেওয়া হয়েছে।
আইনগত ও প্রশাসনিক প্রয়াস: আদালত রায়ের সঙ্গে লন্ডন মিউজিয়ামে থাকা সরস্বতী মূর্তির প্রত্যর্পণের বিষয়টিও কেন্দ্রীয় সরকারের সামনে পরীক্ষার সুপারিশ করেছে এবং আবেদনকারীরা এই বিষয়ে বহুবার আবেদন করেছেন—সরকার এই আবেদনগুলো বিবেচনা করতে পারে, বলেছে আদালত। পাশাপাশি ধার ও ইন্দোর প্রশাসন সতর্ক অবস্থান নিয়ে উভয় পক্ষকে শান্তি রক্ষার আবেদন জানিয়েছে ও আইন-শৃঙ্খলা জোরদারে নির্দেশ পেয়েছে।
প্রতিক্রিয়া: হিন্দু পক্ষের আইনজীবী জানিয়েছেন, তারা আদালতে ২৪ দিনের নিয়মিত শুনানিতে জোরদার প্রমাণ-প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং এএসআই রিপোর্ট, ঐতিহাসিক গেজেটিয়ার ও স্থাপত্যগত তথ্য আদালতের বিবেচনায় প্রাধান্য পেয়েছে বলে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে মুসলিম পক্ষের আইনজীবী আদালতের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট নন—তারা শিগগিরই রায়ের বিস্তারিত খতিয়ে দেখবেন এবং প্রয়োজন হলে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার কথা বলেছেন; একই সঙ্গে তারা এএসআই-এর সমীক্ষা রিপোর্টকেও পক্ষপাতী উল্লেখ করে চ্যালেঞ্জ করার কথা জানিয়েছে।
রায়ের ফলে ভবিষ্যৎ: বর্তমানে ভোজশালা ১৯৫৮ সালের আইনের অধীনে সংরক্ষিত স্থাপত্য হিসেবে রয়ে গেছে এবং এএসআই তদারকি করবে। মুসলিম পক্ষ ব্যবহার করা হয় এমন ইতিহাস, সরকারি গেজেট ও দীর্ঘদিনের ব্যবহার তুলে ধরে প্রতিবাদ জানাচ্ছে; এ ব্যাপারে তারা সড়কভিত্তিক বা উচ্চ আদালতে আপিলের পথ নিতে পারেন বলে সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয়ভাবে প্রশাসন শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছে যাতে এলাকায় উত্তেজনা না ছড়ায়।
পটভূমি-সংক্ষিপ্ত টাইমলাইনে: ১৯৯৫ সালে প্রশাসন মঙ্গলবারে পূজা ও শুক্রবারে নামাজের সংযোজনী ব্যবস্থা চালু করে; ১৯৯৭–৯৮ সালে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপের ইতিহাস আছে; ২০০৩ সালে বর্তমান ব্যবস্থাটি পুনরায় প্রতিষ্ঠা পায়; ২০২২ সালে হাইকোর্টে আপিল দাখিল হয়; ২০২৪ সালে এএসআই ৯৮ দিনের জরিপ করে; আর ২০২৬ সালে এই উচ্চ আদালতের রায় আসে।
সূত্র: বিবিসি, ইন্ডিয়া টুডে, এনডিটিভি এবং স্থানীয় সংবাদসূত্রগুলোকে বিচার করে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।









