আওয়ামী লীগের সময় র্যাবের টিএফআই সেলে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের ব্যবহৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ এ জবানবন্দি দেয়া সময় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর (পল্টন) জোনের সহকারী সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, জঙ্গি হওয়া সম্পর্কে স্বীকারোক্তি না দিলে তাদের লাশ কেটে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়া হয়। সোমবার (০৪ মে) ট্রাইব্যুনালে ৪ নম্বর সাক্ষী হিসেবে শফিকুল এই কথা বলেন।
জবানবন্দিতে শফিকুল বলেন, ২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারি জাপান গার্ডেন সিটির কাছে থেকে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়া হয় তাকে। তুলে নেওয়া ব্যক্তিরা নিজেদের প্রশাসনের লোক বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। ধরে রাখা কক্ষটির আয়তন ছিল মাত্র চার ফুট দৈর্ঘ্য ও চার ফুট প্রস্থ। সেখানে তাকে জিজ্ঞাসা করা হতো কোনো মাত্রায় জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত কি না এবং স্বীকারোক্তি দিতে বলা হতো।
স্বীকার না করলে লাঠি দিয়ে পেটানো হতো, তিনি বলেন। এক পর্যায়ে তাকে এক চেয়ারে বেঁধে অন্য দুই বন্দী—শায়খ আব্দুর রহমান ও জসিম উদ্দিন রহমানীকে সার্ফ এক্সেল দিয়ে ধুয়ে তাদের পেট থেকে সবকিছু বের করা হয়েছে বলে দেখানো হয়েছিল এবং একই রকম স্বীকারোক্তি না দিলে লাশ কেটে টুকরো করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। অন্য হুমকিতে বলা হয়েছে, এখানে রেখে কাউকে পাগল বানিয়ে পরে ঢাকা শহরে ছেড়ে দেওয়া হবে; ঢাকার অনেক পাগল তাদেরই তৈরি বলে একজন জানিয়েছিলেন।
শফিকুল আরও বলেন, স্বীকারোক্তি না দেয়ায় তাকে বসতে, শুতে বা ঘুমাতে দেয়া হতো না; বেশি সময় দাঁড় করিয়ে রাখা হতো। যে কোনো সময় ঘুমাতে দেখা গেলে পেছন হাতে হাতকড়া লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হবে বলে বলা হতো। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকায় মেরুদণ্ডে প্রচণ্ড ব্যথা হয় এবং চোখ বেঁধে রাখায় মাথাব্যথা ও ঘোর লাগার মতো অবস্থা হয়েছিল, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ায় চোখ বের হয়ে যেতে পারে এমনও অনুভব হয়েছে।
বন্দি থাকা অবস্থায় গোসলের জন্য একবারে মাত্র তিন মিনিট সময় দেয়া হতো বলে তিনি জানান। গোসলের সময় একজন ভেতরে ঢুকে বেদম মারধর শুরু করতেন। বাথরুমের দরজা খোলা রাখা হতো এবং বাইরে একজন রক্ষী দাঁড়াত। পানি দেয়া হতো ট্যাপ থেকে; গোসলের জন্য একমাত্র একহাতের হাতে লাগানো হাতকড়া খুলে দেয়া হতো। আটক অবস্থায় দাঁত পরিষ্কারের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। যে ঘরে রাখা হয়েছিল সেখানে জানালা, লাইট বা ফ্যানও ছিল না।
এই মামলায় মোট ১৭ আসামির মধ্যে বর্তমানে ১০ জন গ্রেপ্তার রয়েছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, কর্নেল কে এম আজাদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম, সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) খায়রুল ইসলাম, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মশিউর রহমান জুয়েল ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন।
পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক এম খুরশিদ হোসেন, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ এবং সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন।
শফিকুলের জবানবন্দি ট্রাইব্যুনালে গ্রহণ করা হয়েছে; তার দেওয়া বিবরণ তদন্ত ও মামলার অন্যতম প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
