জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অভিযোগ করেছে, নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে যারা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো, সরকার তা পরিত্যাগ করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। যদি এভাবে চলতে দেয়া হয়, তখন সরকার কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠবে—এজন্য সরকারকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাধ্য করতে হবে বলে বক্তারা মত দিয়েছেন।
রোববার (৩ মে) রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের মুক্তিযোদ্ধা হলে এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক জাতীয় কনভেনশনে এসব কথা বলা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির সহ-প্রধান সারোয়ার তুষার।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক হান্নান মাসউদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী এবং সমাজবিজ্ঞানী মির্জা হাসান। তারা ধরাশায়ী প্রতিশ্রুতি, সংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পছন্দমত বদল এবং বিভিন্ন অধ্যাদেশ আইন করার ক্ষেত্রে সরকারের একতরফা সিদ্ধান্তকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন।
হান্নান মাসউদ বলেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনের পরই স্পষ্ট হয়ে গেছে—অনেক প্রতিশ্রুতি কেবল ছদ্মবেশ। এমন আইন ও অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে যেগুলো সরকারের ক্ষমতা বাড়ালেও জবাবদিহি কমিয়ে দেয়। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপসারণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা বিরোধী দলের কাউকে অপছন্দ হলে সরিয়ে দিয়ে প্রশাসক বসানোর সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের কমিশন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত উদ্যোগ ও সংবিধান সংশোধনের মতো বিভিন্ন প্রস্তাবকে বাতিল বা পিছিয়ে দিয়ে সরকার দায়িত্ব থেকে সরে যাচ্ছে। এনসিপি কিছু বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও বিএনপির প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের আচরণ উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, ১৯৯১ সালের পরে যে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেখা গেলো, তা বাস্তবে রূপায়িত হয়নি। ২৪-এর অভ্যুত্থানের পর যে লক্ষ্যগুলো ছিল, সেগুলো ভেস্তে দিয়েছে একেকটি এলিট—সিভিল, মিলিটারি ও বুরোক্রেসি—যারা ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংসদীয় বক্তব্য যদি কানাডার মতো গণতান্ত্রিক দেশে দেওয়া হতো, তাহলে সেই মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হত।
সমাজবিজ্ঞানী মির্জা হাসান জুলাই সনদকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি অনন্য ডকুমেন্ট হিসেবে বর্ণনা করেন। তার কথায়, জুলাই সনদের মূল বক্তব্য ছিল বিচার, আইন ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। যদিও প্রথম দিকের কিছু প্রস্তাব র্যাডিকাল ছিল—যাতে একই ব্যক্তির দলীয় ও সরকার প্রধান হওয়ার বিরোধিতা ছিল—তবুও যা রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল, তা বড় অর্জন ছিল এবং তা বাস্তবায়নই চাই।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, অনেকেই বিএনপিকে সুবিধা দিতেই ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দিয়েছেন, কিন্তু সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এ ধারা শেষ করে দিয়েছে—বিএনপি সরকার আর সংস্কার করতে চায় না। তিনি অভিযোগ করেন, দলীয়করণ করে সংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিজেদের লোক বসিয়ে সরকার তাদের ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করছে।
সেশন সভাপত আখতার হোসেন বলেন, বিএনপি সরকারের প্রকৃত লক্ষ্য হল ক্ষমতা নিরঙ্কুশভাবে উপভোগ করা। তিনি নোট অব ডিসেন্ট সংক্রান্ত বিতর্কের প্রসঙ্গে বলেন, ঐকমত্য কমিশনের রিপোর্টে যেসব মূল বিষয়ে সবাই একমত ছিল, সেসবই প্রকৃত মূল ইস্যু—ব্যাঙ্গনগত নোট অব ডিসেন্ট নয়। তিনি বিএনপিকে প্রশ্ন করেন, কোন দিকগুলোতে তারা গণভোট বা সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবে আপত্তি করছে এবং কেন তা দেশের স্বার্থে নেতিবাচক মনে করে।
সেশনটি মডারেট করেন জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা সরকারের প্রতি দাবি জানান—প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন ও বিচার, শাসন ও নির্বাহী শক্তির মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে, নতুবা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠার স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হবে।
