কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ জানিয়েছেন, প্রথম পর্যায়ে সারাদেশের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ২২,০৬৫ জন কৃষককে কৃষক কার্ড প্রদান করা হবে। তিনি বলেন, নতুন বছরের পহেলা বৈশাখে টাঙ্গাইলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
আজ রোববার সচিবালয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন পিআইডি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান কৃষিমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং কৃষি ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সচিব উপস্থিত ছিলেন।
কৃষিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কৃষকদের আর্থ-সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণ, কৃষি খাতের সার্বিক উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে স্পষ্ট রূপরেখা দিয়েছেন। এর লক্ষ্য হচ্ছে আত্মনির্ভর, জলবায়ু-সহিষ্ণু ও প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে উৎপাদন ও বিপণনই হবে তথ্যভিত্তিক।
তিনি বলেন, কৃষককে ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং কৃষিকাজকে জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। এজন্য সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি কৃষকের জন্য কৃষক কার্ড প্রদান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা, কৃষি খাতে ডিজিটাল রূপান্তর ঘটিয়ে দুর্নীতিমুক্ত সেবা ব্যবস্থা গঠন করা এবং কৃষকের মর্যাদা বাড়ানোই সরকারের প্রত্যাশা। কার্ডটি একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড হিসেবে কার্যকর হবে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় শাখায় কৃষকদের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে।
অপরদিকে, কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রমটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে—প্রি-পাইলটিং, পাইলটিং ও দেশব্যাপী পর্যায়। প্রাক-পাইলটের অংশ হিসেবে ১১টি ব্লকে কৃষক কার্ড বিতরণ করা হবে। এই ব্লকগুলো হলো:
কমলাপুর (পঞ্চগড় সদর, পঞ্চগড়), উথলি (শিবগঞ্জ, বগুড়া), কৃপালপুর (শৈলকুপা, ঝিনাইদহ), রাজাবাড়ি (নেসারাবাদ, পিরোজপুর), রাজারছড়া (টেকনাফ, কক্সবাজার), অরণ্যপুর (আদর্শ সদর, কুমিল্লা), সুরুজ (টাঙ্গাইল সদর, টাঙ্গাইল), তেনাপঁচা (গোয়ালন্দ, রাজবাড়ী), ফুলতলা (জুড়ি, মৌলভীবাজার), পাঁচপীর (গোদা, পঞ্চগড়) এবং গাইবান্ধা ব্লক (ইসলামপুর, জামালপুর)।
প্রি-পাইলটে শুধু ফসল উৎপাদনকারী কৃষকই নয়—মৎস্যচাষী, মৎস্য আহরণকারী, প্রাণিসম্পদ খাতের খামারি, দুগ্ধ খামারি ও লবণচাষীসহ ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় শ্রেণীর কৃষকদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, ১১ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে মোট ২২,০৬৫ জন কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের শ্রেণীবিভাগ অনুযায়ী সংখ্যা হলো: ভূমিহীন ৪৬ জন, প্রান্তিক ৯,৪৫৮ জন, ক্ষুদ্র ৮৯৬ জন, মাঝারি ১,৩০৩ জন এবং বড় ৫১ জন। কার্যক্রমে নির্বাচিতদের মধ্যে ফসল উৎপাদনকারী ২,১৪১ জন, মৎস্যজীবী ৬৬ জন, প্রাণিসম্পদ খামারি ৮৫ জন এবং লবণচাষী ৩ জন। মোট বাছাইকৃত কৃষকের মধ্যে প্রণোদনার জন্য নির্বাচিত ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের সংখ্যা ২০,৬৩১ জন, যা মোটের প্রায় ৯৩.৭ শতাংশ।
পাইলট পর্যায়ে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য কার্ডের মাধ্যমে বার্ষিক সরাসরি নগদ প্রণোদনা হিসেবে প্রতি জনকে ২,৫০০ টাকা প্রদান করা হবে। কৃষক কার্ড ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট ডিলারের পিওএস/প্রিন্ট সেল মেশিনের মাধ্যমে সার, বীজ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সম্পর্কিত খাদ্য ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ কেনা যাবে। এর ফলে সরবরাহশুদ্ধতা ও ট্রানজেকশন ট্রেসযোগ্য হবে।
প্রাক-পাইলটিংয়ের জন্য বরাদ্দ বাজেট প্রাক্কলিতভাবে ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। যদি প্রাক-পাইলট সফল হয়, তবে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশের আরও ১৫টি উপজেলায় পাইলট কার্যক্রম করা হবে। পাইলট থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে আগামী চার বছরে সারাদেশে কার্ড বিতরণ ও সমৃদ্ধ ডাটাবেস তৈরির কাজ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হবে।
কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, পহেলা বৈশাখে টাঙ্গাইলের শহীদপুর মারুফ স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে প্রাক-পাইলট কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। কুমিল্লা জেলার অরণ্যপুর ব্লকের কার্ড বিতরণ আলাদা করে ১৭ এপ্রিল ২০২৬-এ সম্পন্ন হবে; বাকি ১০টি ব্লকে একই দিন অনুষ্ঠান হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, কৃষি একটি সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা। এই কৃষক কার্ড কৃষকের মর্যাদা আরও উজ্জ্বল করবে এবং সময়োপযোগী নতুন সেবা সংযুক্তির মাধ্যমে কৃষকদের কাজ ও আয়ের নিরাপত্তা বাড়াবে। কার্ডভিত্তিক স্মার্ট ডাটাবেস তৈরি হলে সারপাচ্য রোধ, চাহিদা অনুযায়ী ফসল উৎপাদন ও সরকারের মাধ্যমে কৃষকের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণসহ বহু প্রশাসনিক ও বাজারসংক্রান্ত সুবিধা পাওয়া যাবে।
সূত্র: বাসস
