ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের অনুকরণে খুলনা জেলার প্রায় ২৫ লাখ নারী-পুরুষকে আধুনিক চিকিৎসার আওতায় আনা হচ্ছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে রোগীদের সব স্বাস্থ্যসেবা রেকর্ড সংরক্ষণ করে আরেক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে খুলনাকে পাইলট জেলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, বছরের মধ্যে জেলার মানুষ আধুনিক চিকিৎসা সেবা পেতে পারবে।
সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে ই-হেলথ কার্ড প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন আছে। ওই প্রকল্পের পাইলটিং কার্যক্রমে খুলনা জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—এ কথা সংসদে গত বুধবার সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়।
খুলনা বিভাগীয় উপ-পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডাঃ মোঃ মুজিবুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, প্রশাসন জেলা সরকারি হাসপাতালগুলোর প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছে। প্রকল্প অনুমোদন হলে জেলাবাসী আরও সুবিধায় এবং দ্রুতগতিতে চিকিৎসা সেবা পাবেন।
ই-হেলথ কার্ড কী: এটি প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা একটি ইউনিক আইডি বহনকারী ইলেকট্রনিক কার্ড। কার্ডের মাধ্যমে রোগীর সকল মেডিকেল রেকর্ড—রোগের বিবরণ, পরীক্ষার রিপোর্ট, পূর্বের অসুখ-বিসুখ এবং ওষুধ সেবনের তথ্য—ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা হবে। কেউ যখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন, চিকিৎসক মাত্র কয়েক সেকেন্ডে রোগীর পুরো ইতিহাস দেখে উপযুক্ত চিকিৎসা দিতে পারবেন। ফলে অনাবশ্যক পরীক্ষা-নিরীক্ষা কমবে, সময় বেঁচে যাবে এবং রোগী-চিকিৎসক উভয়েরই হয়রানি কমে আসবে।
জেলার স্বাস্থ্যচিত্র: জেলায় ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কপিলমুনি স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র, টুটপাড়া তালতলা হাসপাতাল, খালিশপুর লাল হাসপাতাল ও সদর শহরে নিয়মিত চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে—এ তথ্য দিয়েছে খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয়।
কমিউনিটি ক্লিনিক বণ্টন ও ওষুধ সংকট: জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। কয়রায় ৩১টি, পাইকগাছায় ৩৭টি, ডুমুরিয়ায় ৪০টি, ফুলতলায় ১০টি, দিঘলিয়ায় ১৬টি, তেরখাদায় ১৪টি, রূপসা ও বটিয়াঘাটায় প্রতিটি এলাকায় ২০টি করে এবং দাকোপে ২৪টি কমিউনিটি ক্লিনিকে শনিবার-বৃহস্পতিবার ছাড়া প্রতিদিন রোগী চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন। তবে এসব ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহে সমস্যা রয়েছে। প্যারাসিটামল, এন্টাসিড (৬৫০ মিগ্রা), প্যারাসিটামল সাসপেনশন, ক্লোরাম্হেক্সিকল ও ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ট্যাবলেটের বাইরে আনুমানিক ১৫ ধরনের ওষুধ প্রতি মাসে প্রায় ১৫ দিন ধরে সংকটে পড়ে থাকে এবং এই সংকট মেটানোর স্থায়ী উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি। বিশেষ করে শীতের সময়ে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অন্যান্য রোগের ওষুধ কমিউনিটি ক্লিনিকে পাওয়া না গেলে রোগী ভোগান্তিতে পড়ে।
চিকিৎসক ও জনবল সংকট: জেলার স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে মোট ৩৫৫টি বিশেষজ্ঞ, মেডিকেল অফিসার ও নার্সের পদ থাকলেও সেইগুলোর মধ্যে ১৫৬টি পদ শূন্য পড়ে আছে। শূন্যপদগুলোর মধ্যে রয়েছে জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনী) ৩টি, জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ২টি, জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) ৩টি, জুনিয়র শিশু বিশেষজ্ঞ ৩টি, জুনিয়র চক্ষু বিশেষজ্ঞ ৬টি, জুনিয়র চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ ৭টি, আবাসিক মেডিকেল অফিসার ৭টি, মেডিকেল অফিসার ৬টি, সহকারী সার্জন ২১টি, জরুরি মেডিকেল অফিসার ২৬টি, ইউনিয়ন পর্যায়ের সহকারী সার্জন ৩৬টি, প্যাথলজিস্ট ১টি এবং অন্যান্য স্টাফ হিসেবে নার্স, স্বাস্থ্যপরিদর্শক, স্বাস্থ্য সহকারী, হেলথ এডুকেটর, ওয়ার্ড বয়, সুইপার ও ল্যাব এটেনডেন্টেরও ঘাটতি রয়েছে।
রোগের প্রচরণ: উপকূলীয় এলাকার রূপসা, দিঘলিয়া, ফুলতলা ও কয়রায় ডায়রিয়া সারাবছর সাধারণ সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। গত সালের ১ নভেম্বর থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন মোট ৫২৫৮ জন রোগী; এ তালিকায় ফুলতলা উপজেলা শীর্ষে রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছাড়াও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালে সহস্রাধিক শিশু এই সময়কালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
আশা ও প্রত্যাশা: অভিজ্ঞরা বলছেন, ই-হেলথ কার্ড প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রোগী তথ্য দ্রুত পাওয়ার সুবিধা এবং সেবার মান বাড়ার মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক বেশি কার্যকর হবে। খুলনার সাধারণ মানুষও আশা করছেন—প্রকল্প অনুমোদন হলে তাদের জন্য চিকিৎসা আরও সহজতর ও আধুনিক হবে।
