শিক্ষা ও গবেষণায় বিশ্বের মান বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার জন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি উল্লেখ করেন, এ যাবত আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বমানের র্যাংকিংয়ে যতটা চাওয়া হয়, তা এখনো সম্পূর্ণভাবে অর্জিত হয়নি। এর মূল কারণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য, গবেষণা প্রকাশনা, সাইটেশন এবং উদ্ভাবন এই বিষয়গুলোতে উন্নতি অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বসভায় টিকে থাকাটা কঠিন হয়ে পড়বে।
মঙ্গলবার (১২ মে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘ট্রান্সফর্মিং হাইয়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ: রোডম্যাপ টু সাসটেইনেবল এক্সিলেন্সি’ শীর্ষক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, গবেষণা ও উদ্ভাবনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সময় এআই, রোবটিক্স, बिग ডাটা, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংসহ আধুনিক প্রযুক্তির চাহিদা বেড়েছে। এতে করে শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা ব্যবস্থার বিকাশের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, মুখস্থ বিদ্যা ও সার্টিফিকেটের উপর নির্ভরশীল শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। শিক্ষাক্রমে শিল্পখাতের চাহিদা অনুপাতে পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা ও শিল্পখাতের মধ্যে ভাল সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি বলেন, শিক্ষার মূল প্রেরণা হওয়া উচিত, বিষয়গত জ্ঞান ছাড়াও প্রকৃত কর্মদক্ষতা অর্জন। তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ, ইনোভেশন ও উদ্যোক্তা উন্নয়নক্রম ব্যাপকভাবে চালু হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণার ক্ষেত্রে প্রাচীন ও নবীন এলামনাইদের সম্পৃক্ত করতে আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের সঙ্গে সমন্বয় কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। একারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণায় অনুদান ও পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, দেশের মেধাবী তরুণরা যদি সুযোগ পায়, তবে তারা বিশ্বমানের অবদান রাখতে পারে। এ জন্য মেধা পাচারেরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী ব্রিটিশ লেখক টম উইনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, উবার, ফেসবুক, আলিবাবার মতো বিশ্বনেতাদের মূল শক্তি হচ্ছে উদ্ভাবন ও স্মার্ট আইডিয়া। তারা নিজেদের জন্য ব্যবসা বা সম্পদের সঞ্চয় করেনি, বরং প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সেবা সম্প্রসারণ করেছে। তিনি বলছেন, এই উদাহরণগুলো থেকে আমাদের শেখা উচিত, যাতে করে আমাদেরও প্রযুক্তিনির্ভর নতুন পন্থায় এগিয়ে যাওয়াটা সম্ভব হয়।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য আরও অর্থায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা দিতে সরকার প্রস্তুত। দেশের শিক্ষার্থীরা আধুনিক জ্ঞান, বিজ্ঞান, অর্থ ও প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করলে, তারা দুনিয়ায় নিজেদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের দেশের কিছু আলামনাই বিদেশে সফল হয়ে থাকলেও, আমাদের দায়িত্ব তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে আরো সক্রিয় সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মেধাভিত্তিক দেশ গড়ার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সীমিত সম্পদ দিয়ে হলেও, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থায় নতুন উন্নয়ন সম্ভব। আমাদের তরুণেরা যথেষ্ট মেধাবী, শুধু তাদের সুযোগ দিতে হবে। মেধা পাচার রোধে সরকার কঠোর হতে হবে।
অপশাসন আর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মূল ভূমিকা থাকা তরুণ প্রজন্মের শহীদ হওয়ার ঘটনাগুলো স্মরণ করে তিনি বলেন, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তারা রক্ত দিয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে দীর্ঘ অধঃপতনের পর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়তে হলে এমন একটি পরিবেশ তৈরির বিকল্প নেই যেখানে শিক্ষা, গবেষণা আর সৃজনশীলতা বিকশিত হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখন প্রয়োজন, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজের স্বপ্নকে বিকশিত করতে পারবে। তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা অর্জনে আমাদের অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের মার্জিত রন্ধ্রে একি কঠোর নজরদারিও রাখতে হবে। এ জন্য শিক্ষক, সাংবাদিক ও পেশাজীবীদের প্রতি তাদের সতর্কতা ও সচেতনতার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ প্রধান অতিথিকে ক্রেস্ট প্রদান করেন। বক্তব্য রাখেন শিক্ষামন্ত্রী আ.ন.ম. এহছানুল হক মিলন, শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক ও ইউজিসির সচিব ফখরুল ইসলাম।
