যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি হত্যা মামলায় নতুন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য আদালতের নথিতে উঠে এসেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ২৬ বছর বয়সী হিশাম আবুঘরবেহ তদন্তকারীদের খতিয়ে দেখার আগে চ্যাটবট চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কিভাবে কাউকে কালো প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে ডাম্পস্টারে ফেলে দিলে তা আড়াল করা যায়—এমনই তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি। ওপেনএআই এ বিষয়ে এখনও কোনো মন্তব্য করেনি।
আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, ১৩ এপ্রিল রাতেই হিশাম চ্যাটজিপিটিকে ‘কাউকে কালো প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে ডাম্পস্টারে ফেলে দিলে কী হয়’—এমন ধরনের প্রশ্ন করেছিলেন এবং পরে ‘তদন্তকারীরা কীভাবে এটি খুঁজে পাবে’—এমনও জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তদন্তকারীরা এই কথোপকথন নথিভুক্ত করেছেন বলে জানা গেছে।
নিহত লিমন ও বৃষ্টি উভয়েই ২৭ বছর বয়সি ও সম্ভাবনাময় ডক্টরাল শিক্ষার্থী ছিলেন। হিশাম—যিনি নিজেও আগে ইউএসএফ-এর ছাত্র ছিলেন—তাঁদের হত্যার অভিযোগে ‘ফার্স্ট-ডিগ্রি মার্ডার’ বা পরিকল্পিত হত্যার চার্জে অভিযুক্ত। মামলায় জমা দেওয়া তদন্ত নথি ও গণমাধ্যম রিপোর্ট অনুযায়ী ঘটনাপট ও সময়রেখা নির্দেশ করে একটি গড়িমসিহীন এবং পরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্য চিত্র।
পুলিশি অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, লিমন ও বৃষ্টিকে শেষবার জীবিত দেখা গিয়েছিল ১৬ এপ্রিল সকালে। ওই দিন লিমনকে টাম্পার ইউএসএফ ক্যাম্পাস থেকে তিন ব্লক দূরের বাড়িতে দেখা যায়; আর বৃষ্টিকে ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক ও পরিবেশ বিজ্ঞান ভবনে দেখা গিয়েছিল—ফ্লোরিডার সিএনএন এর প্রতিবেদন এই অবস্থান তথ্য প্রকাশ করে।
১৭ এপ্রিল হিশামের এক রুমমেট তাকে অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের ডাস্টবিনে কিছু কাঠের বা কার্ডবোর্ড বক্স ফেলতে দেখেন; পরবর্তীতে পুলিশ সেই ডাস্টবিন তল্লাশি করে লিমনের স্টুডেন্ট আইডি ও একটি ক্রেডিট কার্ড উদ্ধার করে। একই সময়ে ডাস্টবিনে পাওয়া একটি ধূসর রঙের টি-শার্টের ডিএনএ টেস্ট লিমনের সঙ্গে মিলেছে এবং একটি কিচেন ম্যাটে পাওয়া ডিএনএ বৃষ্টির জিনের সঙ্গে মিলে যায়—এমনটাই জানানো হয়েছে।
গত শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের পাশে একটি ভারী প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে লিমনের বিকৃত দেহাবশেষ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিক ময়নাতদন্তে বলা হয়েছে যে তার শরীরে একাধিক ধারাল অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। একই সময়ে তদন্তকারীরা বলছেন, বৃষ্টির নিখোঁজ থাকা দেখে পুলিশের ধারণা তিনি বেঁচে নেই এবং অভিযুক্তই তার দেহ সরিয়ে ফেলেছেন। রোববার (২৬ এপ্রিল) তল্লাশিকালে ‘মানুষের দেহাবশেষ’ উদ্ধারের কথা জানালেও তা এখনো শনাক্ত করা যায়নি বলে জানানো হয়েছে।
তদন্তকারীরা আরও জানিয়েছে, ওই হত্যার রাতে হিশামের গাড়ি ব্রিজের কাছে দীর্ঘ সময় থেমে ছিল—এ খবরটি লিমনের ফোন লোকেশন ডেটা ও সিসিটিভি ফুটেজে উঠে এসেছে। প্রথম দিকে হিশাম দাবি করেছিলেন যে তিনি ১৬ এপ্রিল লিমন ও বৃষ্টিকে ক্লিয়ারওয়াটারে নামিয়ে দিয়েছিলেন; কিন্তু পরে যখন তার বিরুদ্ধে থাকা অবস্থানীয় প্রমাণ দেখানো হয়, তখন তার বিবৃতি পরিবর্তন করা হয়।
পুলিশি খতিয়ান অনুযায়ী, হিশাম ওই রাত্রেই বড় ধরনের ডাস্টবিন ব্যাগ, লাইসল (পরিষ্কারের স্প্রে) ও সুগন্ধি স্প্রে (ফেব্রেজ) কেনা এবং তার অ্যাপার্টমেন্টে রক্তের দাগ পাওয়া যায়। এছাড়া বৃষ্টির ব্যবহৃত গোলাপি রঙের ফোন কভারসহ কয়েকটি বস্তু তিনি ফেলে দিয়েছেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। আর প্রথম জিজ্ঞাসাবাদে হিশামের বাঁ হাতে একটি আঙুলে ক্ষত ও পরে পায়েও জখমের চিহ্ন দেখা যায়; তিনি দাবি করেছিলেন সেগুলো পেঁয়াজ কাটা সময় দুর্ঘটনাবশত হয়েছে।
হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস এ ঘটনাকে উদ্বেগজনক ও সম্প্রদায়কে নাড়া দেওয়া বলেছে। হিলসবোরো কাউন্টি পাবলিক ডিফেন্ডার অফিসের হোমিসাইড ব্যুরো প্রধান জেনিফার স্প্র্যাডলি বলেছেন, এ বিষয়ে তাদের কোনো মন্তব্য নেই। হিশামের বিরুদ্ধে হত্যা ছাড়াও শারীরিক নির্যাতন, বেআইনি আটক, মৃত্যুর খবর না জানানো, মৃতদেহ ঠিক স্থানে না রাখা ও আলামত নষ্ট করার মতো বেশ কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি বর্তমানে জামিন ছাড়াই হিলসবোরো কাউন্টি জেলে আটক আছেন এবং তাঁর পরবর্তী শুনানি আগামী মঙ্গলবার ধার্য করা হয়েছে।
লিমনের পরিবারও ঝড়ের মত এই ঘটনার মধ্যে ভেঙে পড়েছে; ভাই জুবায়ের আহমেদকে উদ্ধৃত করে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো বলেছে—লিমন ও বৃষ্টি দুইজনই ছিলেন সম্ভাবনাময় গবেষক, বন্ধুত্ব থেকে তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এবং তারা ভবিষ্যতে বিবাহের কথাও ভাবছিলেন। উভয়েই গ্রীষ্মের ছুটিতে বাংলাদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন।
ঘটনার সব দিক এখন তদন্তাধীন। আদালতের নথি ও সাংবাদিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ওঠা এই তথ্যগুলো মামলাটিকে আরও জটিল ও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রমাণ-ভিত্তিক অনুসন্ধান চলমান এবং প্রয়োজনীয় হলফ-নথি, ফরেনসিক রিপোর্ট ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।
