গেল মার্চে রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) এসে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ে এবং চলতি এপ্রিলেও এ প্রবাহ ইতিবাচক ছিল। এর প্রভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে আবার ডলার কিনতে শুরু করলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের মোট (গ্রোস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৫.০৪ বিলিয়ন ডলারে। আইএমএফের বিপিএম-৬ হিসাবপদ্ধতিতে রিজার্ভ দেখালে তা প্রায় ৩০.৩৬ বিলিয়ন ডলার।
তুলনায় দেখা যায়, এক মাস আগের—that is ১৬ মার্চ—মোট রিজার্ভ ছিল ৩৪.২২ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী ২৯.৫২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক মাসে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার।
তবে মোট রিজার্ভের সবটিই ব্যবহারযোগ্য নয়। স্বল্পমেয়াদি দায়-দায়িত্ব ও অন্যান্য বাধ্যবাধকতা বাদ দিলে যে নিট বা প্রকৃত রিজার্ভ থাকে, সেটিই অর্থনীতির জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংক অভ্যন্তরীণভাবে ‘ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ’ হিসাব করে; সেখানে আইএমএফের এসডিআর, ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ক্লিয়ারিং হিসাব ও আকুর বিলের মতো কিছু খাত বাদ দেওয়া হয়। এই হিসাব সাধারণত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয় না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার। যদি প্রতি মাসে গড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় ধরা হয়, তাহলে এই রিজার্ভ দিয়ে পাঁচ মাসেরও বেশি সময় আমদানি চালানো যাবে। সাধারণভাবে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় সমপরিমাণ রিজার্ভকে নিরাপদ ধরা হয়।
অতীতে রিজার্ভ চাপে ছিল—কিছু সময় ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ১৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যায়। তখন সরকার বৈদেশিক ঋণ নেয়া এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার সংগ্রহ করার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বতী সরকার দায়িত্ব নেবার পর নতুন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি কমিয়ে দেন। একই সঙ্গে হুন্ডি ও অর্থপাচার রোধ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং বিভিন্ন উৎস থেকে ডলার সরবরাহ বাড়ানোর জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়। এসব উদ্যোগ ধীরে ধীরে রিজার্ভকে পুনরায় শক্ত করে তোলে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়ায় দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বেড়েছে এবং তাই রিজার্ভ শক্তিশালী হচ্ছে। বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কিনছে, ফলে রিজার্ভ ভালো অবস্থানে এসেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ডলারের দাম অত্যধিক কমে গেলে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—তাই প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, ২০২১ সালের আগস্টে দেশের রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ওপরে পৌঁছেছিল; তখন প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল প্রায় ৮৪.২০ টাকা। পরবর্তী সময়ে ঋণ অনিয়ম, অর্থপাচার ও অন্যান্য কারণে রিজার্ভে চাপ আসে এবং তা কমতে থাকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় রিজার্ভ নেমে আসে ২৫.৯২ বিলিয়ন ডলারে; আইএমএফ হিসাব অনুযায়ী তখন তা ২০.৪৮ বিলিয়ন ডলার ছিল। ওই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়ে ডলারের দর ১২০ টাকার ওপরে ওঠে, ফলে আমদানিতে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
পরে অন্তর্বতী সরকারের উদ্যোগে ধীরে ধীরে ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা হয়, প্রবাসী আয় বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং আমদানির ওপর বিধিনিষেধ ধাপে ধাপে শিথিল করা হয়। তুলনামূলকভাবে উদার বাণিজ্য নীতির ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে শুরু করে এবং তা রিজার্ভ পুনরুদ্ধারে সহায়ক হয়।
চলতি এপ্রিলের প্রথম ১৫ দিনে দেশে এসেছে ১৭৯ কোটি ডলারের প্রবাসী আয়—যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১.৫ শতাংশ বেশি (গত বছর একই সময়ে এসেছিল ১৪৭ কোটি ডলার)। গত কয়েক মাস ধরে রেমিট্যান্সে ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেখা যাচ্ছে; মার্চে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা এক মাস হিসেবে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে ফেব্রুয়ারি ৩০২ কোটি, জানুয়ারি ৩১৭ কোটি এবং ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।
প্রবাসী আয় বৃদ্ধির কারণে বাজার থেকে ডলার সংগ্রহ করে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো থেকে ৫৬১ কোটি ডলার কিনেছে। এর ফলেই রিজার্ভ আবারও তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে ফিরে এসেছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে জ্বালানি তেলের দাম অনিশ্চিততায় রয়েছে; এমন প্রেক্ষাপটে রিজার্ভ বৃদ্ধিকে সংশ্লিষ্টরা স্বস্তিদায়ক হিসেবে দেখছেন।
