বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, সংসদের প্রথম দিনের স্পিকারের ভাষণ থেকে যে নিরপেক্ষতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল তা বাস্তবে বিরোধীদল বিলকুলই পায়নি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলার সুযোগ না পেয়ে তাদের সংসদ থেকে ওয়াকআউট করতে বাধ্য হতে হয়েছে, তিনি জানান।
আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জেলা ও মহানগর আমির সম্মেলনের উদ্বোধনী সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম অধিবেশনে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করার কথা থাকলেও অধিকাংশই আলোচনা করে শেষ করা হয়নি। কার্য উপদেষ্টা কমিটি এসব অধ্যাদেশ সংসদের টেবিলে আনার বিষয়ে সম্মত ছিল, তথাপি তা বাস্তবায়িত হয়নি এবং আলোচ্যসূচিতে মাত্র একটি বিষয়ে আলোচনা রাখা হয়।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘‘এসব অধ্যাদেশের মধ্যে ছিল দুদক পুনর্গঠন, মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ সংস্কার, গুম প্রতিরোধ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’’ তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধী দল নোট অব ডিসেন্ট দিলেও তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়নি।
সংসদে বিতর্কের সময়সীমা নিয়েও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ‘দুই মিনিটে কোনো পার্লামেন্টারি বিতর্ক হয় না, দুই মিনিটে শুধু মন্তব্য পাস করা যায়,’ বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। পরে সময় কিছুটা বাড়ানো হলেও তা যথেষ্ট ছিল না এবং সরকারের পক্ষে দীর্ঘসময় বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, অভিযোগ জানান তিনি।
ব্যাংকিং খাত নিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অতীতে ব্যাংক থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা লুট হয়ে বিদেশে পাচার হওয়া সত্ত্বেও তা উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এসব অর্থ উদ্ধার ও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ আটকে দেওয়া হয়েছে, তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে পরিবর্তন এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হয়েছে, যা দেশের আর্থিক ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। একজন ঋণখেলাপিকে পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এরপর তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে এখন তফসিলি ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর দিকেও ‘কালো হাত’ বাড়ানো হচ্ছে। ‘‘ব্যাংক কোনো দলের সম্পত্তি নয়, এটি জনগণের। সাধারণ মানুষের আমানত রক্ষায় সবাইকে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করতে হবে,’’ বলে তিনি দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার আলাদা চিত্র থাকায় অসংগতি তুলে ধরেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, সরকার যেখানে বলছে জ্বালানির সংকট নেই, সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং ও জ্বালানির অভাবে মানুষের ভোগান্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফার্নেস অয়েলের ঘাটতি অনেক শিল্পকারখানাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে, পরিবহন খরচ বেড়ে জনজীবনে ও দ্রব্যমূল্যে চাপ বাড়ছে এবং চাঁদাবাজির কারণে মানুষ অতিরিক্ত বোঝা অনুভব করছে বলে জানান তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও নীতিগত ভুল থেকেই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। তাই জাতীয় স্বার্থে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং যে সংস্কারমূলক অধ্যাদেশগুলো আনা হয়েছিল সেগুলো জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী বিল আকারে সংসদে উপস্থাপন করতে হবে। ‘ভুল মানুষ করতে পারে, কিন্তু সেই ভুল থেকে সরে এসে সমাধান খুঁজতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।
শেষে ডা. শফিকুর রহমান সতর্ক করে বলেন, জনগণের মতামত উপেক্ষা করা হলে তা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী হবে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় সঙ্কটের সৃষ্টি করতে পারে।
