দুই দিন পেরিয়েও উদ্ধার হয়নি সুন্দরবনে দস্যুদের হাতে অপহৃত ১০ জেলে

সুন্দরবনের গভীরে বন্দুকধারী দস্যুদের হামলায় অপহৃত হওয়া ১০ জেলের কোনো খোঁজ মেলেনি, দুই দিন পার করেও উদ্ধার অভিযানে এখনও সাফল্য আসেনি। স্থানীয়রা বলছেন, পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠা দুষ্কৃতীরা সুন্দরবনের নিরাপত্তারই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।

স্থানীয় ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার (১৫ এপ্রিল) গভীর রাতে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আওতাধীন জিউধারা স্টেশন অঞ্চলের বরইতলা টহল ফাঁড়ি সংলগ্ন শুয়ারমারা খালে নৌকায় মৎস্য আহরণ করছিলেন একদল জেলে। তখনই প্রায় ১৫-২০ সদস্যের সশস্ত্র ‘করিম শরীফ বাহিনী’ হঠাৎ করে হামলা চালায়। দস্যুরা জেলেদের মারধর করে তাদের সামগ্রী লুটে নেয় এবং ১০ জনকে জিম্মি করে ট্রলারযোগে বনের ঘন অন্ধকারে নিয়ে যায়।

অপহৃত ১০ জন জেলের মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি মোংলার সুন্দরবন ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে। তাদের নাম: নাসির শেখ-এর ছেলে মানিক শেখ, আরোভ গাজীর ছেলে আবু বকর গাজী, আমজাদ ফরাজীর ছেলে জাকির ফরাজী, হানিফ সিকদারের নুরজামাল সিকদার এবং ওহিদ মুন্সির ওয়াহিদ মুন্সি। বাকি পাঁচজনের বাড়ি পার্শ্ববর্তী মোড়েলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় থাকলেও তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। প্রিয়জনদের নিখোঁজ সংবাদ পেয়ে পরিবারের সদস্যরা গভীর আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তায় দিনরাত কাঁপছেন।

অপহৃতদের পরিবারগুলোর দাবী, দস্যুরা মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে প্রত্যেক জেলের জন্য ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করেছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি না পূরণ করলে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দিয়েছে। এই ঘটনার পর থেকে স্থানীয় জেলেদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়েছে; অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে বন ত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছেন, যার ফলে উপকূলীয় মাছ আহরণে বড় ধরণের ব্যাঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন (মোংলা) গোয়েন্দা বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, অপহারের খবর পেয়ে তৎক্ষণাৎ সুন্দরবনের সম্ভাব্য পথসমূহে উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়েছে। পশুর নদীসহ গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বন বিভাগের জিউধারা, চাঁদপাই ও ঢাংমারী স্টেশনের কর্মকর্তারা কোস্ট গার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে তল্লাশি চালাচ্ছেন। তবে সুন্দরবনের প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিবেশ ও দস্যুদের ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তনের কারণে উদ্ধারকাজে জটিলতা দেখা দিচ্ছে।

স্থানীয় সচেতন মহল ও বিশ্লেষকদের মতে, এক সময়ে র‌্যাব ও কোস্ট গার্ডের কঠোর অভিযানের ফলে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে টহল ও তৎপরতা কিছুটা শিথিল হলে সুযোগ নিয়ে নতুন দস্যু বাহিনী গড়ে উঠছে। তারা মনে করেন সুন্দরবনকে স্থায়ীভাবে নিরাপদ রাখতে আবারও সময়োপযোগী ও পরিপক্ক ‘স্পেশাল ড্রাইভ’ বা ব্যাপক অভিযানের দরকার রয়েছে।

সিকিউরিটি বিশ্লেষকরা জানান, এই ধরনের অপহরণ কেবল একটি অপরাধই নয়, এটি উপকূলীয় অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের আত্মবিশ্বাসের ওপর প্রভাব ফেলে। দ্রুত এই ১০ জেলেকে উদ্ধার করে দস্যু দমন কার্যক্রম না শক্ত করলে উপকূলীয় জনজীবন ও মৎস্য আহরণ খাতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়বে এবং জনগণের মধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হবে।

অপহৃতদের পরিবার ও স্থানীয়রা দ্রুত কার্যকর তদন্ত ও তৎপর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের তৎপরতা কামনা করছেন। প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট এলাকায় অভিযান ও বৈঠক জোরদারে ব্যস্ত রয়েছেন, এবং তারা আশ্বাস দিয়েছেন—সব দিক বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।