বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশে আন্দোলনের সূচনা হয়েছে। এখন এটি তিলে তিলে সফলতার দিকে এগিয়ে নেওয়ার সময়। সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট (আইইডিবি) মিলনায়তনে ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার সংকটের মুখোমুখি বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
তিনি বক্তব্যের শুরুতেই একটি ছোট গল্পের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। গল্পে তিনি দড়ি টানা পাখার উদাহরণ দিয়ে বলেন, এক বিচারক একটি হত্যা মামলার রায় দেওয়ার সময় পরস্পরবিরোধী কথা বলছিলেন। পরে জানা গেল, পেছন থেকে দড়ি টানার অসুবিধার জন্য এমনটি ঘটছে। এ গল্পের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিরোধপূর্ণ সিদ্ধান্তের পেছনে অদৃশ্য শক্তির হাত রয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের দেশে, বিশেষ করে পার্লামেন্টে যারা থাকেন, তাদের মধ্যে কে দড়ি টানে? সেই দড়ি কোথা থেকে টান দেওয়া হয়? এই প্রশ্ন এখন সবাই বুঝতে পারছেন।
তিনি সরকারের দ্বৈত নীতিরও সমালোচনা করেন এবং বলেন, এক সময় গণভোট হারাম, আবার কিছু সময় হালাল। এক সময় অর্ডার অনুযায়ী গোস্ত হালাল, কিন্তু শুরুটা ঝোলের হারাম। এসব নিয়ে আমরা পার্লামেন্টে কথা বলেছি, তবে আমাদের কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টাও হয়েছে। তবু আমরা আমাদের বক্তব্য অব্যাহত রেখেছি, কারণ জনগণ আমাদের এই অধিকার দিয়েছে বলেই আমরা কথা বলছি।
তিনি বর্তমান সংসদকে ‘জুলাই প্রোডাক্ট’ নামে অভিহিত করে বলেন, ‘জুলাই নয়, আমরা আছি, সরকারও আছে, বিরোধীদলও আছে, আর কিছুই নেই। এই জুলাইয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই এখন আমাদের লক্ষ্য। গণভোটের মাধ্যমে এই জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ইনশা আল্লাহ পূরণ হবে। তার জন্য জীবনের কমতি থাকলে করতেও প্রস্তুত।’
নিজেদের সংসদে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা আগেই বলেছিলাম, আমরা এই সংসদ থেকে সুবিধা নিতে যাচ্ছি না। অনেক কিছু সময়ের জন্য নেওয়া হবে, তবে নীতির বাইরে যাওয়া হবে না। যে বাধ্যবাধকতা আছে, সেটিতেই থাকবো, অবৈধ কিছু করব না।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, এই গণঅভ্যুত্থান শুধু শিক্ষিত ছাত্র বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আন্দোলন নয়। তিনি ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষ্য দিয়েছেন, এই শহীদদের মধ্যে ৬২ শতাংশই শ্রমিক। তিনি প্রশ্ন করেন, তারা কি কোটার বৈষম্য বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল? না, তারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, পরিবর্তনের জন্য বুক চিতিয়ে লড়েছিল। তারা জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছে, তারা গুণগত রাজনীতির জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত।
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমিরে মজলিস আল্লামা মামিনুল হক, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (বাংলাদেশ) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমদ, আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মোহাম্মদ মনির।
আন্দোলনের শুরু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আন্দোলন শুরু করতে হবে এটিও আন্দোলনের অংশ। যখন আমরা সংস্কার পরিষদের সভার জন্য নোটিশ দিয়েছিলাম, তখন সংখ্যাগরিষ্ঠের হোটে আমাদের গায়ের জোরে সেটি বাতিল করা হয়। এরপরই আমরা বলেছি, জনগণের রায় নিয়ে রায় বাস্তবায়নে আবার আমরা পার্লামেন্টে যাচ্ছি।’
জামায়াতের আমির বলেন, এই আন্দোলন সুবিধাবাদী নয়, এটি ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারা নয়। মূল লক্ষ্য হচ্ছে ৭০ ভাগ মানুষের রায় ও শহীদদের রক্তের সঙ্গে অঙ্গীকার। বর্তমান সরকারের একচেটিয়া অধিকার ও আচরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য তিনি সবাইকে আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, আমরা চাই, আমাদের সন্তানদের কারো গোলামি করতে দিই না। বাংলাদেশে রাজতন্ত্র বা ফ্যাসিবাদ মেনে নেওয়া যাবে না। সবাই মিলেই এই দেশকে উন্নত করতে হবে, কোনও বোঝা বা অন্ধকারের উদ্যোগে পা দেওয়া চলবে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই দুষ্টচক্র ভেঙে ফেলার জন্য সবাই একসাথে কিছু করতে হবে। সংসদের সময়ের বড় অংশ অন্যের প্রশংসায় নষ্ট হলে চলবে না; বরং সেখানে জনতার সমস্যা ও সমাধানই মুখ্য হওয়া উচিত। তিনি সরকারের সমালোচনা করে আরও বলেন, আজও আমরা ফ্যাসিবাদের ছায়া দেখছি সংসদে। কিছু সদস্যের আচরণে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, সকলকেই সংযত হতে হবে ও দেশরত্নের ইতিহাসকে সম্মান করতে হবে। এই দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী তাদের মূল্যবোধ অটুট রাখতে হবে।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ, নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এলডিপির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমদ, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মোহাম্মদ মনির।
