ইসলামাবাদে সমাপ্ত আলোচনা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইতিমধ্যেই পাকিস্তান ত্যাগ করেছেন, ফলে আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবু বিশ্লেষকরা মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের আসল চাহিদা যুদ্ধ থামানোই — তাদের সামনে অন্য কার্যকর বিকল্প মেলে না।
আন্তরিকতা দেখানোর লক্ষ্যে ভ্যান্সকে পাঠানো হয়েছিল; ওয়াশিংটন বারবার জানিয়েছে তারা বিষয়টি নিয়ে গম্ভীর। কিন্তু জেডি ভ্যান্স ফিরে যাওয়ার পর থেকেই আলোচনা কি স্থগিত, নাকি দূর থেকে চালানো হবে—এই প্রশ্ন উঠেছে। আল জাজিরার জন হেনড্রেন বলছেন, ভ্যান্সের প্রত্যাগমনই আলোচনা বন্ধের নিশ্চয়তা নয়; দীর্ঘ দর-কষাকষি প্রয়োজনে দূর থেকে চালিয়ে নেয়া যায়।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন, যেই ফল আসুক না কেন আমেরিকা সামরিকভাবে বিজয়ী হয়েছে এবং তিনি এতে খুব বেশি উদ্বিগ্ন নন। অনেকে এই বক্তব্যকে আড়োচোখে দেখছেন। কারণ চলমান সংঘাতটি আমেরিকার জনমতে বেশ অজনপ্রিয়—এক-তৃতীয়াংশেরও কম নাগরিক এটিকে সমর্থন করছেন। শেয়ারবাজারে পতন এবং জ্বালানির দাম বাড়ায় ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চ্যালেঞ্জের মধ্যে সবচেয়ে বড়টি হলো হরমুজ প্রণালী — যা কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। ট্রাম্প চাইছেন এই অবস্থা বদলাতে; কিন্তু এই مسئয়টাই আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার আগে বড় ব্যাধি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে দুই মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি ইঙ্গিত করছে যে ওয়াশিংটন বিকল্প পথ সম্পর্কে ভাবছে।
আলোচনায় মূল বিষয় ছিল না শুধু পরমাণু কর্মসূচি বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সঞ্চয়, বরং এবার আলোচনার পরিধি অনেক বড়—নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া—এসব জটিল ইস্যুও তালিকায় রয়েছে। মার্কিন পক্ষ ইরানকে কেবল বলে দিচ্ছে না যে পরমাণু অস্ত্র বানানো যাবে না, বরং চায় ইরান সেই প্রযুক্তি অর্জনের চেষ্টা থেকেই বিরত থাকার অঙ্গীকারও করবে। এমন ধরনের বিষয় সমাধান করতে সময় লাগে—২০১৫ সালের ঐতিহাসিক চুক্তিতেও প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের রস হ্যারিসন সতর্ক করে বলেছেন, যদি আমেরিকার কড়া শর্তগুলো কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ না থেকে পর্দার আড়ালেও একই রকম বলিষ্ঠতা বজায় থাকে, তাহলে সমঝোতার সম্ভাবনা কম। তার মতে, ইরান ইতিমধ্যেই এই সংঘাতে ব্যয়বহুল ক্ষতির সম্মুখীন — বিশেষ করে জনগণকে বড় মূল্য দিতে হয়েছে। তাই ইরান সহজে আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না।
আলোচনার অবসান πολλকে অবাক করেছে, কারণ দুই পক্ষকে একই টেবিলে আনতে বড় কূটনৈতিক শ্রম লেগেছিল। তবে এক প্রবীণ কূটনীতিক জানিয়েছেন যোগাযোগের চ্যানেল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়নি। পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা আঞ্চলিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে বসিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে, এবং পাকিস্তান এই সূত্র বজায় রাখার পক্ষে।
পাকিস্তান সরকার দাবি করেছে, লেবাননসহ হুতি ও ইরাকি সশস্ত্রগোষ্ঠীগুলো যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে বলে জানিয়েছিল; কিন্তু বৈরুতেতে ইসরায়েলি হামলা সেই সূক্ষ্ম সমীকরণকে তছনছ করে দিয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে।
দুই পক্ষই আলোচনার খুঁটিনাটি গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল; কৌশলগত ও কারিগরি বিষয়ের বিষয়ে তেমন বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। যাইহোক, আলোচনায় ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন নিয়ম চালুর বিষয়টি প্রথমবারের মতো কেন্দ্রে এসেছে — ইরান বলছে তারা ওই পথ শত্রুদের জন্য বন্ধ রাখতে পারে, যার ফলে বিশ্ব জ্বালানির বাজারে বড় প্রভাব পড়েছে।
একই সঙ্গে ইরান সব যুদ্ধক্ষেত্রে একযোগে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি দাবিও তুলেছে, যা আমেরিকা ও ইসরায়েলের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। ইরানের ১০ দফা ও মার্কিন ১৫ দফা দাবির মধ্যে মিল কম; তাই বিবাদ কেবল এক-দুই বিষয়ে সীমাবদ্ধ থেকেছে না।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, কূটনীতি কখনোই শেষ হয় না; কূটনৈতিক কাঠামো জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তিনি জানিয়েছেন, ইরান, পাকিস্তান ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে।
এখন প্রশ্ন—এরপর কী? গত বুধবার যে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছিল, তা মার্কিন প্রেসিডেন্টের কড়া বিবৃতির পর ভূমিকা পেয়েছিল; কিন্তু পুনরায় হামলার সম্ভাবনা নিষ্ক্রিয় নেই। পাকিস্তান জানাচ্ছে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা জরুরি এবং তারা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে আগ্রহী। তবু আলোচনার ভবিষ্যৎ এখন বড় অংশেই ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। বিশ্বজুড়ে নজর এখন ট্রাম্পের পরবর্তী কথাবার্তার দিকে।
(তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি)
