চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম আট মাসে রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি থাকায় দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি) রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই সময়ের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি এক হাজার ৬৯১ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা বাংলাদেশি টাকায় দুই লাখ সাত হাজার কোটি টাকার বেশি। গত অর্থবছরের একই সময় এই ঘাটতি ছিল এক হাজার ৩৭১ কোটি ডলার।
রপ্তানি কমা ও আমদানির বাড়তি চাপই প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও বহু পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকায় আমদানির খরচ বেড়েছে। এছাড়া বর্তমানে ফেব্রুয়ারি মাসে রমজানকে কেন্দ্র করে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল ও খেজুরের মতো নিত্যপণ্যের আমদানি বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক আমদানিও হাঁকেছে। একদিকে আমদানির চাপ বাড়লেও রপ্তানি আয় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কমে গেলে বাণিজ্য ঘাটতি তীব্র হয়।
ব্যাংকের তথ্যে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই–ফেব্রুয়ারি সময়ে দেশে পণ্যের আমদানি হয়েছে ৪ হাজার ৬১৭ কোটি ডলার (৪৬.১৪ বিলিয়ন ডলার), যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫.৬ শতাংশ বেশি। একই সময় পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩০.০৩ বিলিয়ন ডলার। আমদানি ও রপ্তানির এই ব্যবধানেই চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার প্রধান কারণ দেখা গেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে আমদানি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রপ্তানি বাড়াতে হবে। তিনি না হলে মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা উভয় ক্ষেত্রেই চাপ বাড়বে এবং অর্থনীতিকে জটিল পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে।
চলতি হিসাব (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) সম্পর্কে রিপোর্টে বলা হয়েছে, দেশ এখন সামান্য ঋণাত্মক অবস্থায় আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ফেব্রুয়ারি শেষে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি ডলার, যেটি আগের বছর একই সময়ে ছিল ১৪৭ কোটি ডলার।
অন্য সূচকে সামগ্রিক লেনদেন বা ওভারঅল ব্যালান্স ভালো অবস্থায় আছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আলোচিত সময়ে সামগ্রিক লেনদেনের অবস্থান বেড়ে ৩৪৩ কোটি ডলার হয়েছে; যেখানে আগের বছরের একই সময়ে এটি ঋণাত্মক করে ১১৫ কোটি ডলার ছিল।
রেমিট্যান্স ও বিনিয়োগের দিকে গেলে, অর্থবছরের প্রথম আট মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা মোট ২ হাজার ২৪৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় শতকরা প্রায় ২১.৪ শতাংশ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কিছুটা কমেছে। গত অর্থবছরের জুলাই–ফেব্রুয়ারি সময়ে এটি ছিল ১০৬ কোটি ডলার, আর চলতি অর্থবছরে তা নামিয়ে এসেছে ৮৭ কোটি ডলারে। তবে শেয়ারবাজারে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ নেগেটিভ অবস্থায় রয়েছে; প্রথম আট মাসে নিটভাবে বিদেশি বিনিয়োগে ৮ কোটি ডলার বেরিয়ে গেছে, যা আগের বছরের অনুরূপ অবস্থার সঙ্গে মিলে যায়।
সংক্ষেপে, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও দেশজ আমদানির বাড়তি চাহিদা মিলিত হয়ে চলতি অর্থবছরের আট মাসে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এখন আমদানি নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের দিকে ফলপ্রসূ নীতি নেওয়া জরুরি।
