বাগেরহাটের খানজাহান আলী (রহ.) মাজার সংলগ্ন দিঘির প্রধান ঘাটে গত বুধবার বিকেলে এক কুকুরকে শিকার করেছে মাজারস্থ কুমির। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা ছড়ায় ও অভিযোগ ওঠে যে কুকুরটিকে বেঁধে কুমিরের সামনে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
ওই ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় দেখা যায়, কুকুরটি প্রথমে ঘাটে একা এসে পড়ে এবং পানির মধ্যে নামার চেষ্টা করে। মুহূর্তের মধ্যে কাছাকাছি এসে কুমিরটি কুকুরটিকে ধরে নিয়ে যায়। পরে কুকুরটির মৃতদেহ ভেসে উঠলে মাজারের খাদেমরা সেটি মাটি চাপা দিয়ে দাফন করে। কিছু লোক দাবি করেন কুকুরটি অসুস্থ্য হওয়ায় তারা সেটি মাটিচাপা দিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী এবং মাজারের নিরাপত্তাকর্মী ফোরকান হাওলাদার জানান, ওইদিন ঘাটে দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের ভিড় ছিল। হঠাৎ নারীদের ঘাটের দিকে থেকে এক আক্রমণকারী কুকুর দৌড়ে এসে তার পায়ে কামড় দেয়। নিরাপত্তা প্রহরী কুকুরটিকে ঠেকাতে চাইলে কুকুরটি দিঘির দিকে নামতে উঠে; সে সময় কুমিরটি এসে কুকুরটিকে ধরে পানির ভেতরে নিয়ে যায়। ফোরকান বলেন কুকুরটি আগে থেকেই অসুস্থ্য ছিল এবং অনেককে কামড়িয়েছে।
মাজারের খাদেমরা ও স্থানীয়রা অভিযোগসমূহ খণ্ডন করে বলেছেন, ঘটনাটিকে অসত্যভাবে উপস্থাপন করে ভিডিও ও ম্যানিপুলেটেড তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তারা বলছেন, কাউকে কুকুরটিকে বেঁধে কুমিরের সামনে ছুঁড়ে দেওয়ার মতো সাহস ছিল না। স্থানীয় যুবক মেহেদী হাসান (তপু) বলেন, কয়েকদিন আগে ওই কুমির ডিম পেড়েছিল; ডিম পাড়ার পর কুমিরটি একটু হিংস্রভাবে আচরণ করতে পারে।
ঘটনার পর জেলা প্রশাসন বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতিয়া খাতুনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হচ্ছেন সদর উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।
আজ বিকালে কুকুরটির ময়নাতদন্ত করা হয়েছে; কুকুরটির মাথা সিডিআইএল (সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরি) এ পাঠানো হয়েছে। জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাহেব আলী জানান, সিডিআইএল এর রিপোর্ট পেলে কুকুরটি অসুস্থ্য ছিল কিনা বা জলাতঙ্কে আক্রান্ত ছিল কিনা জানা যাবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-র সদস্য শেখ মোহাম্মাদ নূর আলম ঘটনাটি হৃদয়বিদারক বলে মন্তব্য করে বলেছেন, যদি কেউ ভিউ বা বিনোদনের জন্য কুকুরটিকে কুমিরের সামনে ফেলে থাকে, তাহলে কঠোর তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
জেলা প্রশাসক গোলাম মোঃ বাতেন বলেন, মাজারের দিঘিতে কুমিরকে কুকুর খাওয়ানোর কোনো প্রথা নেই এবং এরকম দাবি ভিত্তিহীন। তিনি খাদেমদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন কুমিরকে কোনো জীবিত প্রাণী খাওয়ানো না হয় এবং এ ধরনের কুসংস্কার বন্ধে সচেতনতা বাড়ানো হয়। এছাড়া প্রাণিটির শরীরে কুমিরের আঘাত ছাড়া অন্য কোনো আঘাত আছে কিনা তাও আমরা যাচাই করছি; তদন্ত কমিটি পেলে দ্রুত প্রতিবেদন দেবে এবং তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তথ্য মতে, খানজাহান আলী (রহ.) মাজার সংলগ্ন ওই দিঘিতে দীর্ঘদিন ধরেই কুমির রাখা হলেও বর্তমানে ২০০৫ সালে ভারতের মাদ্রাজ থেকে আনা পাঁচটি কুমিরের মধ্যে কেবল একটি কুমিরই এখন দিঘীতে আছে। ওই কুমির আগেও মাঝে-মধ্যেই মানুষের ওপর আক্রমণ করেছে বলে স্থানীয়রা জানান।
ওই দিন ঘটা কুকুর শিকার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে জেলা প্রশাসনের তদন্ত ও ল্যাব রিপোর্টের ওপর সবাই অপেক্ষা করছে।
