দেশের ব্যাংক খাতে অর্ডার বদল—২০২৪ সালে শুরু হওয়া আর্থিক চ্যালেঞ্জ ২০২৫ সালে আরও স্পষ্ট রূপ নিয়েছে এবং এর সরাসরি দরদামে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) ব্যয় শিগগিরই হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫ সালের (জানুয়ারি–ডিসেম্বর) সময়ে দেশের ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক মিলিয়ে সিএসআর খাতে মোট মাত্র ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৭০ কোটি ৯১ লাখ টাকা—প্রায় ৪২ শতাংশ কম।
এই ব্যয়ের পরিমাণ গত এক দশকে সর্বনিম্ন। আগের রেকর্ড নিম্ন অধ্যায় ছিল ২০১৫ সালে, তখন সিএসআর খরচ ছিল ৫২৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এবারের ব্যয় তার চেয়ে প্রায় ১৮২ কোটি টাকা (৩৪.৫৭ শতাংশ) কম—যা খাতে নতুন নিম্নমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ধারণা করা যায় যে, গত দুই বছরে সিএসআর খাতে ধারাবাহিক পতন হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে সিএসআর ব্যয় ছিল ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা—যা ২০২৩ সালের ৯২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকার তুলনায় ৩০৮ কোটি টাকা বা ৩৩ শতাংশ কম। ২০২২ সালে খাতে ব্যয় ছিল ১,১২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে সিএসআর ব্যয় প্রায় ৫১৩ কোটি টাকা বা ৪৫ শতাংশের বেশি কমে গেছে।
খাতের অভ্যন্তরে বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরে সরকার পরিবর্তনের প্রভাব ব্যাংকিং খাতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। একই সময়ে নানা ব্যাংকের অনিয়ম, লুটপাট ও অর্থ পাচারের তথ্য সামনে আসায় বইয়ে দেখানো কৃত্রিম মুনাফার বিপরীতে প্রকৃত আর্থিক অবস্থার আঁচ মিলেছে। খেলাপি ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক ব্যাংকের প্রকৃত লোকসান শেয়ার হল—বিশেষত কয়েকটি শরীয়াভিত্তিক ব্যাংক বড় ধরনের চাপে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে দুর্বল কয়েকটি ব্যাংকের স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরকার একাধিক ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
ব্যাংকারদের বক্তব্য, রাজনৈতিক পরিবেশ বদলাও সিএসআর ব্যয়ের সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সরকারের সময় নানা স্তর থেকে অনুদান বা সহায়তা দেওয়ার চাপ থাকত; শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যয়ের অনুরোধের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যয় প্রকৃত সিএসআর লক্ষ্য থেকে সরে যেত। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন এবং আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর ঐসব চাপ অনেকটাই কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন তুলনামূলকভাবে কড়াকড়ি নিয়ে সিএসআর ব্যয় নির্ধারণ করছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করান, সিএসআর খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক চাপ কিংবা অনিয়মমূলক হাতিয়ার হিসেবে এই অর্থ ব্যবহার হলে সামাজিক দায়বদ্ধতার মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে তাদের নিট মুনাফার একটি অংশ সিএসআর হিসেবে ব্যয় করা বাধ্যতামূলক; সেখানে শিক্ষায় ৩০ শতাংশ, স্বাস্থ্যে ৩০ শতাংশ, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ২০ শতাংশ এবং বাকি ২০ শতাংশ অন্যান্য খাতে রাখার কথা বলা আছে। তবে বাস্তবে এই অনুপাত মেনে চলা হচ্ছে না—২০২৫ সালে ব্যয়ভাগে ‘অন্যান্য’ খাতে সবচেয়ে বেশি অংশ হয়েছে ৩৬ শতাংশ, শিক্ষায় ব্যয় হয়েছে ২৮.৫৩ শতাংশ, এবং পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে মাত্র ১০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী আলোচিত সময়ে ১১টি ব্যাংক সিএসআর খাতে কোনো অর্থই খরচ করেনি। ওই ব্যাংকগুলো হলো: জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।
আরো উদ্বেগজনক দিক হলো, ২০২৪ সালে যে ১৭টি ব্যাংক নিটভাবে লোকসানে পড়েছিল তাদের তালিকায় রয়েছে জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবিআই ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। এই তালিকার মধ্যে ছয়টি ব্যাংক—এবি ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এনআরবিআই ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক—মুনাফা না করেও সিএসআর খাতে কিছু অর্থ ব্যয় করেছে।
সংক্ষেপে, ব্যাংক খাতে আর্থিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক পরিবর্তন মিলিয়ে সিএসআর ব্যয়ে অবস্থাগত পরিবর্তন এনেছে। ভবিষ্যতে সিএসআর-এর উদ্দেশ্য রক্ষা করতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ব্যয়ের মানসম্মত ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে জনকল্যোন্বিত প্রকল্পেই অর্থ সোজাসুজি পৌঁছে যায়।
