২০২৪ সালে দেশের ব্যাংকখাত গভীর আর্থিক চাপের মুখে পড়েছিল; ১৭টি ব্যাংক নিট থেকে লোকসান ঘোষণা করেছিল। এই অবকাঠামোগত দুর্বলতার প্রভাব পড়ে কর্পোরেট সামাজিক দায়িত্ব (সিএসআর) খাতেও—ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় গত বছরে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। রোববার প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সেন্ট্রাল ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের (জানুয়ারি–ডিসেম্বর) সময়ে দেশের ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক সিএসআর খাতে মোট খরচ করেছে মাত্র ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকা। এটি আগের বছরের তুলনায় কমেছে ২৭০ কোটি ৯১ লাখ টাকা বা প্রায় ৪২ শতাংশ। গত এক দশকে এটি সিএসআর খাতে সবচেয়ে কম ব্যয়। এর আগে ২০১৫ সালে সেক্টরে ন্যূনতম ব্যয় ছিল ৫২৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা; সেই তুলনায় এবার ব্যয় প্রায় ১৮২ কোটি টাকা (৩৪.৫৭ শতাংশ) কমেছে—যা খাতে নতুন নিম্নমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দেখাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও তথ্য দেখায়, ২০২৪ সালে সিএসআর খাতে ব্যয় ছিল ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের (৯২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা) তুলনায় প্রায় ৩০৮ কোটি টাকা বা ৩৩ শতাংশ কম। ২০২২ সালে ব্যয় ছিল ১,১২৯ কোটি টাকা; অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে সিএসআর ব্যয় কমেছে ৫১৩ কোটি টাকারও বেশি—প্রায় ৪৫ শতাংশ।
ব্যালান্সশিটের অবনতি, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যাংকিং খাতে প্রকাশিত অনিয়ম-লুটপাট এসব পতনের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। ব্যাংকার ও খাত সংশ্লিষ্টরা বলেন, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ের (জুন–জুলাই) ছাত্র-জনতার আন্দোলন, আগস্টে সরকার পরিবর্তন ও সেই সময়কার রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যাংকিং কার্যক্রমে বড় ধাক্কা দেয়। একই সময়ে নানা ব্যাংকের অনিয়ম, ঋণ অনুষঙ্গ ও অর্থ পাচারের তথ্য প্রচারে আসায় কাগজে দেখানো মুনাফার বিপরীতে প্রকৃত আর্থিক চিত্র উন্মোচিত হয়; খেলাপি ঋণ বাড়ায় বাস্তব লোকসানও সামনে আসে। বিশেষ করে শরিয়ারভিত্তিক কয়েকটি ব্যাংক বেশি চাপে পড়েছে এবং কিছু শিল্পগোষ্ঠীর ঋণ-অনিয়ম ও অর্থ পাচারের প্রভাব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। এসব কারণে দুর্বল অবস্থায় পড়া ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতা ফিরে আনতে সরকার একাধিক банка একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, সিএসআর ব্যয় কমার আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক চাপ কমে আসা। রাজনৈতিক সরকারের সময়ে বিভিন্ন পর্যায় থেকে অনুদান ও সহায়তার জন্য ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ থাকত; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অনুষ্ঠানসহ নানা খাতে অনুরোধের ভিত্তিতে ব্যয় করা হতো এবং অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো প্রকৃত সিএসআর কার্যক্রমের বাইরে চলে যেত। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের আন্দোলন ও সরকার পরিবর্তনের পরে এসব চাপ অনেকটাই কমেছে; ফলে ব্যাংকগুলো এখন তুলনামূলকভাবে যাচাই-বাছাই করে খরচ করছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সিএসআর খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক প্রভাব বা অনিয়ন্ত্রিত চাপের কারণে অনেক সময় এই অর্থ অনুৎপাদনশীল কাজে ব্যয় হয়; তা হলে সিএসআর-এর মূল সামাজিক উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে তাদের নিট মুনাফার একটি অংশ সিএসআর খাতে ব্যয় করতে বলা হয়—এর মধ্যে ৩০ শতাংশ শিক্ষার জন্য, ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে, ২০ শতাংশ পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এবং বাকি ২০ শতাংশ অন্যান্য উপযোগী খাতে ব্যয়ের কথা বলা আছে। বাস্তবে নির্দেশনা মানা হচ্ছে না; ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি (৩৬ শতাংশ) সিএসআর ব্যয় করেছে ‘অন্যান্য’ খাতে। শিক্ষায় ব্যয় হয়েছে ২৮.৫৩ শতাংশ, স্বাস্থ্যখাতে তুলনামূলকভাবে বেশি, আর পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে মাত্র ১০ শতাংশ বরাদ্দ হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী আলোচিত সময়ে ১১টি ব্যাংক সিএসআর খাতে একটাও টাকা খরচ করেনি। এসব ব্যাংকের নাম: জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।
আরও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে লোকসানে থাকা ব্যাংকদের তালিকায় রয়েছে জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।
এদের মধ্যে ছয়টি ব্যাংক—এবি ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক—মুনাফা না করেও সিএসআর খাতে অর্থ ব্যয় করেছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, আর্থিক চাপ, স্বচ্ছতার ঘাটতি ও রাজনৈতিক প্রভাব মিলিয়ে সিএসআর ব্যয়ের ধরণ ও পরিমাণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাতকে স্থিতিশীল করতে এবং সিএসআর অর্থ সমাজের বাস্তবে পৌঁছে দিতে নিয়ম-নীতি কড়াকড়ি করা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ও প্রকল্পগুলোর ফলাফল-পর্যালোচনা জরুরি।
