ঈদ উপলক্ষে ১৫ দিনে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৫৮৭ মৃত্যুর শঙ্কা

ঈদুল ফিতর উদযাপনের আগে ও পরে দেশের বিভিন্ন যানবাহন পথের ১৫ দিনে ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় অন্তত ৫৮৭ জনের প্রাণহানি হয়েছে বলে সতর্ক করেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য রোড। এ দুর্ঘটনা ও হতাহতের পরিসংখ্যান নিয়ে তারা একটি বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা এই মৌসুমি অপেক্ষা ও পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মার্চ মাসের ১৬ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে সড়ক, রেল ও নৌপথে ঘটেছে মোট ৩ হাজার ৫০১টি দুর্ঘটনা। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৮৫৯ জন। সংগঠনের মতে, এই সময়ের পরিবহন পরিস্থিতিতে বিশৃঙ্খলা, অদক্ষ চালক এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কিছু অংশের অবহেলা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, পরিস্থিতি আরও মারাত্মক হয়ে উঠছে।

সেভ দ্য রোডের মহাসচিব শান্তা ফারজানা জানান, ঈদের সময় অদক্ষ ও ক্লান্ত চালকদের কারণে দুর্ঘটনাগুলোর সংখ্যা বেড়েছে। পাশাপাশি, নারী ও শিশুদের জন্য এই দুর্ঘটনা ও হতাহতের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঈদের সময়কালে ১ হাজার ৯৩৭ নারী ও শিশু আহত হয়েছেন এবং ২৯৪ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ষাটোর্ধ্ব এক পুরুষের মধ্যে আহত ও নিহত হয়েছেন ৮১১ জন, নব্বইয়ের দশকের মধ্যে থাকা ১৮-৫৫ বছরের পুরুষের মধ্যে আহত ১ হাজার ১১১ জন ও নিহত ১৮১ জন।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দুর্নীতি ও অব্যাহত নজরদারির অভাবে সাধারণ মানুষ বেশ বড় ধরনের দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেক যাত্রী অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে বাস না পেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে, যেমন ট্রাক ও পিকআপে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্ঘটনায় মোট ক্ষতি হয় আনুমানিক ৩২০ কোটি টাকার উপর। তারা বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে শুরু হওয়া পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলা এখনো অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। অদক্ষতা, অবহেলা এবং দুর্নীতির কারণে এটি ঘটছে বলে দাবি তাদের। এছাড়া, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও লাইসেন্সহীন চালকদের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে।

তাদের ভাষায়, প্রতিটি ৩ কিলোমিটারে পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতি বা নজরদারি না থাকাও বড় কারণ। এই সময়ে সড়কে ১২২টি ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে আহত হয়েছেন ৯৬ জন। নারী নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে ৩১৬টি শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে এবং একটি ধর্ষণের ঘটনা রেজিস্টার করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ ভুক্তভোগী অভিযোগ দাখিল করেননি।

নৌপথেও পরিস্থিতি অনেকটাই ভয়াবহ। কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশের দায়িত্বে অবহেলার কারণে ১০২টি নৌদুর্ঘটনা ঘটেছে, যেখানে আহত হয়েছেন ১০৩ জন এবং নিহত হয়েছেন ১৫ জন। রেলপথে ২০ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ২১০ জন ও নিহত হয়েছেন ১৪ জন।

অবশ্য, আকাশপথে বড় কোনও দুর্ঘটনা না ঘটলেও জ্বালানি সংকট ও অন্যান্য কারণে সেতো শতাধিক হজযাত্রীসহ মোট ২৫৬ জন পথচারী ভোগান্তির শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংগঠনের চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান মন্ডল, প্রতিষ্ঠাতা মোমিন মেহেদী ও ভাইস চেয়ারম্যান বিকাশ রায়সহ অন্যরা বলেন, দ্রুত সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই পরিস্থিতি সমাধান করা সম্ভব নয়। তাদের মতে, সড়ককে নিরাপদ ও নিয়মের ধারায় আনতে দুর্নীতি দমন, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং জনসচেতনা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

পরে তারা আরও বলেছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই সম্ভব হবে সড়ক, রেল ও নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।