খুলনা অঞ্চলের ইজারা দেওয়া ও বেসরকারি পাটকলগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাপকভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে, এর মূল কারণ হলো কাঁচা পাটের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি। বাজারে কাঁচা পাটের মূল্য এত বেশি বাড়ায়, উৎপাদন খরচ অনেকখানি বেড়ে গেছে, যার ফলে বেশ কিছু পাটমিল তাদের উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন, অধিকাংশ কাজ হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। পাশাপাশি মিলগুলোর আর্থিক ক্ষতিও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ভবিষ্যতে বন্ধ হওয়ার মুখে ঠেলে দিতে পারে তাদের।
দৌলতপুর এলাকার দৌলতপুর জুট মিলে প্রায় দেড় মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। শ্রমিকরা কাজে না গিয়ে কেবল সময় কাটাচ্ছেন। দেশের অন্যত্রও অন্তত একটি ডজনের বেশি মিলের বেশির ভাগই এখন কার্যকলাপে স্থবির। কিছু মিল কিছুটা চালু থাকলেও আকারে কম। শ্রমিকদের আশা, যদি এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তারা স্থায়ীভাবে কাজ হারানোর আশঙ্কায় পড়েছেন।
দৌলতপুর জুট মিলের শ্রমিক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘‘প্রায় দেড় মাস ধরে মিল বন্ধ, কাজ নেই। কাঁচা পাটের অভাবে মালিক মিল চালাতে পারছেন না। যদি এই অবস্থা থাকে, তবে হয়তো আমাদের কাজ থেকে ছাঁটাই করে দিতে পারেন। তো, আমরা কীভাবে আমাদের পরিবার চালাবো?’’ অন্য শ্রমিক হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘‘আমরা কাজ করলে মালিক ২ টাকা আয় করেন, আর আমাদের দিতে হন ১ টাকা। শেষ তিন বছরে এই মিল ভালো চলছিল, কিন্তু এখন দেড় মাস ধরে আমরা বসে আছি। মালিক নিজে না বাঁচলে আমাদের বাঁচাবে কী করে?’’ তারা দাবি করেন, এই সংকটের জন্য সরকারই কঠিন পদক্ষেপ নেবেন।
মিল মালিকরা জানান, মৌসুমের শুরুতে কাঁচা পাটের দাম ছিল প্রায় ৩২০০ টাকা মণ, এখন তা গিয়ে পৌঁছেছে প্রায় ৫২০০ টাকায়। দাম দ্বিগুণের কাছাকাছি বাড়লেও বাজারে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি হয়নি সে অনুযায়ী। এর জন্য উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে উদ্যোক্তারা উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছেন।
দৌলতপুর জুট মিলের উৎপাদন কর্মকর্তা মোঃ ইসরাফিল মলিক বলছেন, ‘‘বর্ধিত দামে পাট কেনার কারণে এখন উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আগে ৩২০০ টাকা দরে পাট কিনে এক বস্তা কিনলে আমরা বিক্রি করতাম ৮০ টাকায়। তবে সর্বশেষ ৪০০০ টাকা দরেও পাট কিনে মিল চালিয়েছি। শ্রমিকদের জন্য লোকসান সত্ত্বেও মিল চালু রেখেছিলাম। কিন্তু এখন ৫২০০ টাকা দরে পাট কিনছি, আর এক বস্তার খরচ এখন ૧২০ টাকার বেশি, কিন্তু বিক্রির মূল্য তা ছাড়িয়ে যাচ্ছে না। ফলে দেড় মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ রেখেছি।’
তাঁর দাবি, এই বছর কাঁচা পাটের উৎপাদন গত বছরের মতোই হয়েছে, কিন্তু ব্যবসায়ীরা দাম artificially বাড়িয়ে রেখেছেন। সরকার যদি নথিপত্র না দেখে, বাজার তদারকি না করেন, তবে মিল চালানো সম্ভব হবে না।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছর ধরে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইলে কাঁচা পাটের উৎপাদন প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই অঞ্চলে ৩৯ হাজার ৩৪৪ হেক্টর জবে ৯৪ হাজার ৬৬৬ মে:টন পাট উৎপাদিত হয়, আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮ হাজার ২৬৮ হেক্টরে ৯১ হাজার ১৩৫ মে:টন।
মিল মালিকদের অভিযোগ, কয়েকটি ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট করে পাট মজুত করে রাখছে, যার ফলে বাজারে দাম বাড়ছে। বাংলাদেশ জুট মিল এসোসিয়েশনের পরিচালক মোঃ জহির উদ্দিন বলছেন, ‘‘নতুন সরকারের কাছে আমাদের দাবি, বাজার নিয়ন্ত্রণ, ভর্তুকি ও তদারকি জোরদার করা। অপরাধমূলকভাবে কিছু ব্যবসায়ী কাঁচা পাট মজুত করে বাজার অস্থিতিশীল করে রেখেছে, যা বা মূলত দাম বাড়ার পিছনে দায়ী।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘ব্যাংকের ঋণ সমস্যা ও বাজারে বিভিন্ন সংকটের কারণে এই খাতের সমস্যা জটিল হয়ে পড়ছে। সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরি।’’
এদিকে, পাট অধিদফতর নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। সহকারী পরিচালক সরজিত সরকার বলেন, ‘‘আড়তদার বা ডিলাররা সর্বোচ্চ এক মাসে ৫০০ মণ পাট মজুত করতে পারবেন, যা আমরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করি। বেশি মজুত পাওয়া গেলে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। আশা করছি শিগগিরই বাজার স্বাভাবিক হতে পারে।’’
খুলনা অঞ্চলে ইজারা ও বেসরকারি মিল মিলিয়ে ২০টি পাটকল আছে। এসব মিলের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন পাটপণ্য উৎপাদিত হয়, যার বড় অংশই দেশের বাইরে রফতানি করা হয়। তবে যদি এই সংকট চলমান থাকে, তবে উত্পাদন ও রফতানি দুটোই বড় ধাক্কা খেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
