ব্যাংকগুলো খেলাপিদের নাম-ছবি প্রকাশ ও বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চায়

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের তীক্ষ্ণ বৃদ্ধি নিরসনে একজোট প্রস্তাব দিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। গত ১২ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে আলোচনার পরে সংগঠনটি এইরকম বিস্তারিত পদক্ষেপগুলোর সুপারিশ ব্যাংককে জমা দিয়েছে।

এবিবির মূল আকাংক্ষাগুলোতে উল্লেখযোগ্য হল: খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম ও ছবি প্রকাশের অনুমতি, তাদের আদালতের নির্দেশ ছাড়া বিদেশে যাত্রা নিষিদ্ধ করা এবং খেলাপিরা যেন কোনো ব্যবসায়িক সংগঠনের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে—এরকম বিধান করা। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করলে খেলাপি ঋণের দ্রুত নিষ্পত্তি ও পুনরাবৃত্তি রোধে সহায়তা হবে বলে তারা মনে করছে।

ঋণখেলাপি কমাতে এবিবির তিনটি প্রস্তাব

1) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কিছু খেলাপি ঋণ আংশিকভাবে অবলোপনের সুযোগ দেওয়া হোক।

2) লিয়েন করা শেয়ার নগদায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সহযোগিতা নিশ্চিত করুক।

3) মৃত্যু, মারাত্মক অসুস্থতা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত, গৃহ বা ক্রেডিটকার্ড সংক্রান্ত সুদ মওকুফ করে দ্রুত ঋণ আদায় সক্ষম করার জন্য হেড অব আইসিসির মতামত গ্রহণের শর্ত শিথিল করা হোক।

নগদ আদায়ে প্রস্তাবিত নির্দেশনা

– খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ব্যাংক অথবা আদালতের ছাড়া বিদেশে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।

– খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম ও ছবি সম্বলিত তালিকা ব্যাংকগুলোকে প্রকাশ করার অনুমতি দেয়া।

– খেলাপিদের ব্যবসায়িক সমিতির নির্বাচনে অংশগ্রহণ অযোগ্য ঘোষণা করা।

বন্ধকী সম্পদ বিক্রিতে সাফলতা বাড়াতে প্রস্তাব

– ব্যাংকের নিলামে বিক্রয় বা কেনা সম্পত্তি হস্তান্তরের সময় প্রযোজ্য সকল আয়কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার করা হোক।

– নিলাম উৎসাহিত করতে নিলাম ক্রেতাদের আয়কর রেয়াত বা অন্যান্য প্রণোদনা দেওয়া হোক।

– জেলা প্রশাসকের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা স্থানভেদে বাতিল করা হোক যাতে নিলাম প্রক্রিয়া দ্রুত হয়।

– সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলো নিলামে বিক্রিত সম্পত্তির হস্তান্তরে সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিশ্চিত করুক।

– বন্ধকদাতার অনুপস্থিতিতে ব্যাংক কর্তৃক জমির খাজনা ও জরিপ সম্পন্ন করার সুবিধা নিশ্চিত করা হোক।

– অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে ব্যাংকের নামে মালিকানা হস্তান্তর হলে নামজারি ও বায়নানামা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিনা খরচে সম্পন্ন করার সুবিধা নিশ্চিত করা।

মামলা বাস্তবায়নে প্রস্তাবিত দফা

– খেলাপি ঋণগ্রহীতা ও জামানতদাতাদের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা আমানত, সঞ্চয়পত্র, মালিকানাধীন সম্পদের তথ্য, আয়কর রিটার্ন, ওয়ারিশ সনদ, জন্ম ও মৃত্যু সনদ, পাসপোর্টের তথ্য আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়া দ্রুতগুলো দিতে সক্ষম করার বিধান।

– ব্যাংক বা আদালতের বিরুদ্ধে আবেদন করলে মামলার সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাউনপেমেন্ট জমা দেওয়ার শর্ত আরোপ করা।

– সিআইবি প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালত থেকে স্টে-অর্ডার প্রাপ্তির সুবিধা আইনি সীমার মধ্যে সীমিত করা হোক।

– উচ্চ আদালতের স্টে-অর্ডারে কিস্তিভিত্তিক অর্থপরিশোধ নিশ্চিত করা এবং নির্দেশনা না মানলে সেটিকে বাতিল হিসেবে গণ্য করার বিচারপ্রক্রিয়া নির্ধারণ করা।

– উচ্চ আদালত থেকে স্টে-অর্ডার প্রদানে উভয় পক্ষের শুনানি নিশ্চিত করার অনুরোধ।

– যে জেলাগুলোতে খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যাবেশি, সেখানে দ্রুত পৃথক অর্থঋণ আদালত স্থাপনের সুপারিশ।

– থানায় খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের আটকাদেশ তৎক্ষণাত কার্যকর করা এবং আদালত থেকে থানায় আটকের আদেশ সাত দিনের মধ্যে প্রেরণ নিশ্চিত করা।

– অর্থঋণ মামলায় ব্যক্তিগত হাজিরা ছাড়া মামলা পরিচালনার সুযোগ সীমিত করা।

– দেওয়ানি আটকাদেশের স্থায়ীকরণ ছয় মাসের পরিবর্তে ঋণের পরিমাণ অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাত বছরে উন্নীত করা।

– দ্রুত সময়ের মধ্যে অর্থঋণ আইনে প্রস্তাবিত সংশোধন প্রণয়ন।

খেলাপি ঋণ না বাড়াতে অবকাঠামোগত প্রস্তাব

– কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ভূমি জরিপকারী ও মূল্যায়নকারীর তালিকা জরুরি ভিত্তিতে দাবি ও প্রকাশ।

– নিবন্ধক বা তহবিল অফিসে বন্ধকী সম্পদের তালিকা সহজে যাচাই করার ব্যবস্থা করণীয়।

– সিআইবি ডেটাবেসের মতো ব্যক্তিগত সম্পদের ডেটাবেস তৈরি করে তা সহজে যাচাইকরণযোগ্য করা।

চূড়ান্ত চিত্র

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ছয় লাখ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৫.৭৩ শতাংশ। মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। ব্যাংকাররা মনে করেন, উপরে উল্লিখিত প্রস্তাবনাগুলো কার্যকর হলে খেলাপি ঋণের বৃদ্ধির ধারা ঠেকানো ও সুদমুক্তি, বিক্রয় ও আদায় প্রক্রিয়া দ্রুততর করা সম্ভব হবে। নীতি যদি তড়িৎভাবে গ্রহণ না করা হয়, তবে খেলাপিরা সহজ উপায়ে দায় এড়িয়ে পুনরায় ব্যবস্থার ফাঁকফোকরকে কাজে লাগাতে পারে—এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে তারা।