মসজিদের নামে রাস্তায় বা যানবাহনে চাঁদা তোলা নিষিদ্ধ

অর্থসাহায্য আসতে পারবে — কিন্তু রাস্তায় চাঁদা তোলা যাবে না। গত ২১ জানুয়ারি অন্তর্বতী সরকার ‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫’ গেজেট আকারে প্রকাশ করে। নীতিমালায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে মসজিদ নির্মাণ ও পরিচালনার খরচ জনগণের স্বেচ্ছায় দেওয়া দান, অনুদান, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিদেশি সংস্থা বা অন্য কোনো বৈধ উৎস থেকে বা্থিকভাবে নির্বাহ করা যাবে। তবে যানবাহন ও রাস্তাঘাটে চাঁদা আদায় করা, উত্তোলন করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগটি আসে ২০২৪ সালের ২৬ জানুয়ারি এক জাতীয় সংসদের বৈঠকের সময় তৎকালীন ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির পরিপ্রেক্ষিতে। ধর্ম মন্ত্রণালয় বলছে, দেশের মসজিদগুলো সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ ও সমন্বিতভাবে পরিচালিত হওয়া জরুরি—এমন লক্ষ্য থেকেই এই নীতিমালা আনা হয়েছে।

মসজিদ নির্মাণ সংক্রান্ত প্রধান বিধানগুলো

নীতিমালায় বলা হয়েছে, মসজিদ নির্মাণ করতে হবে শারিয়াহ সম্মত স্থানে এবং সেসব জমিতে যেখানে মসজিদের নামে ওয়াকফ, দান, ক্রয়কৃত বা আইন অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বরাদ্দকৃত জমি রয়েছে। এই নিয়ম লঙ্ঘন করে যেখানেই মসজিদ তৈরি করা হবে, সেই মসজিদকে উচ্ছেদ করা হবে এবং নির্মাণে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের আইন শাখা জানিয়েছে, শারীয়ত সংক্রান্ত শর্ত পূরণ না করা বা ওয়াকফ/অনুমোদন বহির্ভূত জমিকে ‘অবৈধ’ মনে করা হবে। সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তিগত বা অন্যান্য ধরনের সম্পত্তিতে মসজিদ করা যাবে না।

নারীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থাসহ সামাজিক নিয়ম

নীতিমালায় নারীদের জন্য আলাদা সালাতের কক্ষ বা স্থান ব্যাবস্থার কথাও বলা হয়েছে। মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি—শরীয়ত সম্মতভাবে—নারীদের জন্য পৃথক সমতল বা কক্ষ করে দেবে যাতে তারা শান্তিতে নামাজ আদায় করতে পারেন।

রাজনীতি ও মসজিদ কর্মী

নীতিমালায় নির্ধারিত হয়েছে, মসজিদে কর্মরতরা কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। এই বিধান মসজিদকে অরাজনৈতিক রাখতে ও সামাজিক একতা রক্ষা করতে সাহায্য করবে।

অরাজনৈতিক ধর্মীয় প্রাসঙ্গিক কর্মসূচি

মসজিদে অরাজনৈতিক দ্বীনি দাওয়াত, তাবলিগের মত ধর্মীয় কার্যক্রম এবং নিয়মিত ওয়াজ পরিচালনা করা যাবে—তবে তা মসজিদের ভেতরে এমন একটি পৃথক স্থানে মাত্রা ও নিয়ম মেনে করা হবে যাতে মসজিদের সালাতকারীদের নামাজ বিঘ্নিত না হয়। এই ব্যবস্থার তদারকিতে সাধারণ সম্পাদক ও মসজিদ কমিটি সমন্বয় করবেন।

ইমামদের দায়িত্ব ও বেতন কাঠামো

নীতিমালায় পেশাদার ইমামদের কাজের পরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে—তাফসির, দারুল কোরআন, দারুল হাদিস ও ওয়াজ পরিচালনা করার সুযোগ থাকবে এবং কমিটির সহযোগিতায় এগুলো নিয়মিত চালানো যাবে।

বেতনের ক্ষেত্রে পেশাদার ইমাম ও অন্যান্য কর্মীদের জন্য জাতীয় বেতন স্কেলের নির্দিষ্ট গ্রেড উল্লেখ করা হয়েছে। সিনিয়র পেশাদার ইমাম পাবেন ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলের ৫ম গ্রেড অনুযায়ী বেতন; পেশ ইমাম ৬ষ্ঠ গ্রেড; ইমাম ৯ম গ্রেড; প্রধান মুয়াজ্জিন ১০ম গ্রেড; মুয়াজ্জিন ১১তম গ্রেড; প্রধান খাদিম ১৫তম গ্রেড। নিরাপত্তা প্রহরী (দিবা/নৈশ) ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তেন-ভাতা পাবেন ২০তম গ্রেড অনুযায়ী। আর্থিকভাবে অসচ্ছল বা পঞ্জেগানা মসজিদে করণীয় সামর্থ্য অনুসারে বেতন নির্ধারণ করা যাবে। এই কাঠামো সরকার কর্তৃক জারিকৃত জাতীয় বেতন স্কেলের পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আপডেট হবে।

কমিটি ও সময়সীমা

প্রতি মসজিদে ‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি’ থাকবে। সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত মসজিদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থা কমিটি নিয়োগ করবে; সাধারণ মসজিদে কমিটি নির্বাচন করবে মসজিদের মুসল্লিরা। কমিটির মেয়াদ থাকবে তিন বছর; যুক্তিসঙ্গত কারণে এক বছর পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।

অবৈধ মসজিদ উচ্ছেদ ও আইনগত পদক্ষেপ

অবৈধ স্থানে নির্মিত মসজিদ উচ্ছেদের প্রসঙ্গে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আ.ফ.ম. খালিদ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘অবৈধ জায়গায় মসজিদ নির্মাণ হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা উচ্ছেদ করা হবে। ব্যক্তিগতভাবে কেউ উচ্ছেদ করলে তা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘কেউ বন বিভাগের জায়গা, রেলের জায়গা বা অন্য কারও সম্পত্তিতে মসজিদ করে দিলো—এইটা গ্রহণযোগ্য নয়। জমির মালিকানার ব্যাপারে স্পষ্ট না থাকলে সামাজিক সংঘর্ষও দেখা দিতে পারে।’’

ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (সংস্থা ও আইন অনুবিভাগ) মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘‘শরিয়াহ সম্মত স্থানে মসজিদ করা না হলে এবং যদি কোনো মসজিদ অবৈধ স্থানে নির্মিত হয়, তাহলে দক্ষ কর্তৃপক্ষ সেটি উচ্ছেদ করতে পারবে; যে কেউ নিজে উচ্ছেদ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে পারে। নির্মাণকারী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’’

মোটকথা, নতুন নীতিমালা মসজিদের আর্থিক স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক নিয়ম ও সামাজিক সমন্বয় নিশ্চিত করতে উদ্দীপ্ত—সাথে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির মতো অনৈতিক প্রথা বন্ধ করার কঠিন বার্তাও দিয়েছে।