বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, দেশের মধ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে, এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও উন্নত হবে এবং বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক গতি দ্রুতই বাড়বে। তিনি আরও বলেন, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) রাতে রাজধানীর গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। এই অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর উল্লেখ করেন, দেশের তারল্য সংকট ধীরে ধীরে কমে আসছে। আগে যেখানে অর্থনীতিকে চাপে ফেলত অক্সিজেনের অভাব, যেখানে শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করত তারল্যের অভাব, এখন সেই চাপ কিছুটা কমতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো পূর্বে ঝুঁকি এড়িয়ে বেশি মুনাফা করত, তবে এখন সরকারের অর্থনৈতিক নীতির কারণে তারা অস্বস্তিতে রয়েছে। ভবিষ্যতে নাড়াচাড়া ও সঠিক ঋণগ্রহীতাকে বিবেচনা করে ব্যাংকগুলোকে আরও কঠোর হতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। চলতি অর্থবছরে রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য মূল্যপণ্য সস্তা হওয়ায় দেশের আমদানির ওপর চাপ কমেছে।
সুদ হার নিয়ে তিনি জানান, এই মুহূর্তে এটি দেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। তবে বিনিময় হার মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। দেশের টাকা আরও আকর্ষণীয় করতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার কিনেছে, যা আন্তর্জাতিক বিতরণের চেয়েও বেশি। এছাড়া, বাজারে আরও ৪৫ বিলিয়ন টাকা ছাড় করা হয়েছে। এর ফলে তারল্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
গভর্নর বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা ব্যবসায়ের ওপর কিছু প্রভাব ফেলেছে, তবে যাদের টিকে থাকার সক্ষমতা রয়েছে, তারা সহায়তা পেয়েছে। কোনো দল বা গোষ্ঠীর ভিত্তিতে বৈষম্য সৃষ্টি হয়নি। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, খুব দ্রুত সুদের হার কমানো ঠিক নয় কারণ এতে অর্থনীতির বিনিময় হার ও বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনে অস্থিতিশীলতা বাড়তে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি এখনও ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে, যা লক্ষ্য করা হয় যে ৫ শতাংশের নিচে নামাতে এখনো কিছু সময় লাগবে। মূল্যস্ফীতি ১ শতাংশ কমলেই নীতিগত সুদের হার কমানো হবে। ইতিমধ্যে বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য সুদের হার প্রায় ২ শতাংশ কমানো হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিদিন উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি ডেটা বিশ্লেষণ করছে, যেখানে রয়েছে বিনিময় হার, সুদের হার, রিজার্ভ, রেমিট্যান্স, ও আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত তথ্য। সেই সঙ্গে প্রতিদিনই রেমিট্যান্সের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ চলমান, যেখানে সোমবার রেমিট্যান্স এসেছে ১৭০ মিলিয়ন ডলার বেশি। চলতি মাসে এখন পর্যন্ত, গত মাসের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ৬৯ শতাংশ বেশি। মাসিক ও সাপ্তাহিক ডেটার পাশাপাশি এখন ত্রৈমাসিক জিডিপি রিপোর্টও পাওয়া যাচ্ছে, যা অর্থনীতির তুলনামূলক বিশ্লেষণে সহায়তা করছে।
অতীতের অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এমসিসিআই’র সভাপতি কামরান টি রহমান। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার ও ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর জেমস গোল্ডম্যান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মাসরুর রিয়াজ, এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার প্রমুখ।
