আজ সোমবার শেরেবাংলা নগরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে, চলতি অর্থবছরের জন্য সরকারের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দের ব্যাপক পরিবর্তন ঘোষণা করা হয়। এই সংশোধনী অনুযায়ী, এডিপিতে মোট বরাদ্দ ৩০ হাজার কোটি টাকা কমে গেছে, যার ফলে এখন মোট অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং, এবং এতে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়ারাহিদউদ্দিন মাহমুদ সংবাদ সম্মেলনে জানান, এই সংশোধিত এডিপি অনুমোদনের সময় মূল এডিপির চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ কম করা হয়েছে। ফলে, সরকারি অর্থায়ন ও বিদেশি ঋণ ও অনুদান— উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কাটাছেঁড়া হয়েছে। এর ফলে সরকারি অর্থায়ন কমে হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা, আর বিদেশি ঋণ ও অনুদান নেমে এসেছে প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা।
তিনি এও জানিয়েছেন, প্রকল্পের বাস্তবায়নে ধীরগতি ও দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা, যেমন প্রকল্প পরিচালকের অনুপস্থিতি, পরিচালকের নিয়োগে বিলম্ব এবং বড় প্রকল্পের পুনর্মূল্যায়ন, এই সব কারণেই প্রকল্পের বরাদ্দ কম চাওয়া হয়েছে।
সংশোধিত এডিপি অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে, যেখানে বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ৩৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির এক পঞ্চমাংশেরও বেশি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ২৬ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। এছাড়াও বাসস্থান, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ উন্নয়ন খাতেও এসেছে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ।
অথচ, সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে স্বাস্থ্যখাতে, যেখানে বরাদ্দ প্রায় ৭৪ শতাংশ কমে গেছে। মূল এডিপিতে যেখানে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা, সংশোধিত এডিপিতে তা নেমে এসেছে মাত্র ৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকায়। শিক্ষাও ব্যাপক কাটছাঁটের শিকার হয়েছে, যেখানে বরাদ্দ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ।
প্রধান খাত হিসেবে পরিবহন ও যোগাযোগের বরাদ্দ কমলেও, এই খাতের অংকেও প্রায় ৩৫ শতাংশ কাটা হয়েছে। একইভাবে, সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে, যেখানে মূল এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ১৮ কোটি টাকা, এখন তা মাত্র ৫৪৫ কোটি।
অন্য খাতে যেমন বিদ্যুৎ বরাদ্দ প্রায় ১৯ শতাংশ কম হয়েছে, কৃষিতে সেটি ২১ শতাংশের বেশি। তবে আশার কথা হলো, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও পানি সম্পদ খাতে বরাদ্দ প্রায় ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক বরাদ্দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, যেখানে বরাদ্দ হয়েছে ৩৭ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, যদিও এটি মূল এডিপির তুলনায় কিছুটা কম। এরপর রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, পানি সম্পদ ও শিক্ষা বিভাগ। এছাড়াও, বিশেষ উন্নয়ন সহায়তার জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, সংশোধিত এডিপিতে মোট প্রকল্প সংখ্যা ১ হাজার ৩৩০টি, যার মধ্যে বেশিরভাগই বিনিয়োগ প্রকল্প। পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে এসব প্রকল্পের মধ্যে ২৮৬টি শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মোটামুটি, এই সংশোধিত এডিপি অর্থনীতির বিভিন্ন খাত উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, মানসিক ও বাস্তব সমস্যা এবং প্রকল্পের বাস্তবায়ন দেরিতে পরিপূর্ণতা পেতে পারে বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা।
