পদোন্নতি বিবাদে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘাত: উপাচার্যকে ‘অবাঞ্ছিত’, ১১ মে থেকে পূর্ণ শাটডাউন

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সংকট তীব্র আকার নিয়েছে। শিক্ষক সমাজ উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলমকে ক্যাম্পাসে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করে আগামী ১১ মে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি সম্পূর্ণ শাটডাউনের ঘোষণা দিয়েছে। রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেই এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

শুক্রবার বা শনিবার থেকে শুরু হওয়া বিবাদটির মূল কারণ শিক্ষকদের পদোন্নতি সংক্রান্ত জটিলতা। সিন্ডিকেট সভায় এ বিষয়ে সমাধান না হওয়ায় শিক্ষকরা এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শিক্ষকদের দাবি, পদোন্নতির প্রক্রিয়া নিয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা-সমঝোতা বাস্তবে কার্যকর করা হয়নি এবং উপাচার্য একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন।

এর আগেও এই সমস্যাকে কেন্দ্র করে গত ২০ এপ্রিল থেকে টানা ১০ দিন আন্দোলন চলে; ওই সময় ক্লাস-পরীক্ষাসহ একাডেমিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছিল। পরে ৩০ এপ্রিল বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার, উপাচার্য ও বিভিন্ন অনুষদের ডিনরা অংশ নিয়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে শিক্ষকেরা কর্মসূচি শিথিল করেন এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম ফেরার আশা জাগে।

কিন্তু শিক্ষকরা বলেন, বৈঠকে যে সমঝোতা হয়েছিল তা বাস্তবায়িত হয়নি। তাদের অভিযোগ, ৮ মে রাত ১০টায় দেয়া নোটিশে পরেরদিন বেলা ১১টায় জরুরি সিন্ডিকেট আহ্বান করা হয়; সেখানে সিন্ডিকেট সদস্যদের বড় অংশের মত অবহেলা করা হয়েছে এবং কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি, ফলে পরিস্থিতি আরও জটিলতায় পড়েছে। রোববার অনুষ্ঠিত সাধারণ সভায় শিক্ষকরা সিদ্ধান্ত নেন— ১১ মে থেকে উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা, পূর্ণাঙ্গ শাটডাউন, এবং যারা প্রশাসনিক দায়িত্বে আছেন তাদের পদত্যাগ দাবি।

শিক্ষক নেতারা জানান, বহুদিন আলোচনার মাধ্যমেই তারা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়েছেন; প্রশাসনের গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ না থাকার কারণে শেষ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তারা বিদ্যমান প্রশাসনকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অংশীজনভিত্তিক করার দাবি তুলেছেন।

নতুন কর্মসূচি ঘোষণায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আবারও অস্পষ্টতা ছড়িয়ে পড়েছে; দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থার ফলে সেশনজট আরো বাড়বে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এ ব্যাপারে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তৌফিক আলম বলেন, শনিবারের সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষকদের পাঁচজন প্রতিনিধিসহ সবাই ঐকমত্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন— আগামী দুই মাসের মধ্যে একটি অভিন্ন সংবিধি প্রণয়নের মাধ্যমে তাঁদের পদোন্নতি কার্যকর করা হবে। তিনি বলেন, ‘‘আমরা বিধিমতো শিক্ষকদের পদোন্নতি দিতে সর্বোচ্চ আন্তরিক।’’

দুই জন শিক্ষকের প্রশাসনিক পদ থেকে পদত্যাগের বিষয়ে উপাচার্য জানিয়েছেন, এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো পদত্যাগপত্র তার হাতে পৌঁছায়নি; তারা মৌখিকভাবে অব্যাহতি নেওয়ার ইচ্ছা জানিয়েছিলেন।

পদোন্নতি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, আগে ২০১৫ সালের বিধি অনুসারে পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল; পরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) একটি চিঠিতে সেই কার্যক্রম আটকে দিয়ে ২০২১ সালের অভিন্ন নীতিমালা অনুসরণ করার পরামর্শ দেয়। দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অভিন্ন নীতিমালায় কেনা হলেও বরিশালসহ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় তা গ্রহণ করেনি; ফলে উপাচার্য ২০২১ সালের নিয়োগ সংবিধি সিন্ডিকেটে পাস করে ইউজিসির অনুমোদনের পর পদোন্নতি দেওয়ার পক্ষে ছিলেন।

এই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম কতদিন স্থবির থাকবে তা অনিশ্চিত। শিক্ষক, ছাত্র ও প্রশাসনের মধ্যকার তৎক্ষণাৎ সমঝোতা ছাড়া পরিস্থিতি দীঘ্যালোচনায় যেতে পারে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন। সকল পক্ষকে দ্রুত বসে সমস্যার স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করার আহ্বান জানিয়েছে শিক্ষার্থী সমাজ।