ফেনীর পরশুরামের বক্সমাহমুদ ইউনিয়নে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে জড়িয়ে এক ইমাম মাসখানেক জেলে কাটাতে বাধ্য হন — পরে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষায় প্রকাশ পায় আসল দোষী ওই কিশোরীর বড়ভাই।
অভিযুক্ত ইমাম মোজাফফর আহমদ (২৫)কে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের পর মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। ফরেনসিক পরীক্ষায় কিশোরীর ভূমিষ্ঠ সন্তানের সঙ্গে মোজাফফরের ডিএনএ মেলেনি। বরং তদন্তে ধরা পড়েছে শিশুটির পিতা ছিলেন কিশোরীর বড়ভাই মোরশেদ (২২)।
মোজাফফর অভিযোগ করেন, মিথ্যাচারের জের ধরে তিনি সামাজিক ও পারিবারিকভাবে প্রতারিত হয়েছেন। মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারাতে হয়; এক মাস দুই দিন কারাবন্দি ছিলেন; মানহানি ও আর্থিক ক্ষতির ফলে মামলার খরচ চালাতে বাড়ির পাশে থাকা মূল্যবান ৫ শতক জমি বিক্রি করতে বাধ্য হন। তিনি কারাভোগ, মানহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
পুলিশ ও ফরেনসিক প্রতিবেদনের বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৯ সালে মক্তবের পাঠ শেষ করার পর ওই কিশোরী পাঁচ বছর পর অন্তঃসত্ত্বা হন এবং পরে সন্তান প্রসব করেন। ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর কিশোরীর পরিবার মক্তব শিক্ষক মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করে। মোজাফফর আপত্তি করলেও তাতে কাজ হয়নি; ২৬ নভেম্বর আদালতে মিথ্যা অভিযোগের মামলা দাখিল করতে গেলে তাঁকে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয় এবং তিনি এক মাস দুই দিন কারাভোগ করেন। ২৮ ডিসেম্বর জামিনে বেরিয়ে আইনি লড়াই চালান তিনি।
প্রাথমিক ফরেনসিক তদন্তে কিশোরীর সংরক্ষিত ভ্যাজাইনাল সোয়াবে পুরুষ বীর্যের উপাদান শনাক্ত না হওয়ায় মোজাফফরের ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে তুলনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। এরপর কিশোরী ও তার সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুটিকে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য আদালতের মাধ্যমে পরীক্ষাাগারে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ফরেনসিক রিপোর্ট ফেনীতে আসার পর পুলিশ কিশোরীকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি জানান, আক্রমণকারী ছিলেন তার সহোদর ভাই মোরশেদ। পুলিশ তদন্ত করে ২০২৫ সালের ১৯ মে মোরশেদকে গ্রেপ্তার করে; তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ২০ মে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়া হয়।
পরবর্তীকালে কিশোরী, তার শিশু সন্তান ও মোরশেদকে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ঢাকার ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। ৯ আগস্ট প্রকাশ হওয়া ডিএনএ প্রতিবেদনে মোরশেদের ও শিশুটির ডিএনএ মিলেছে—পরীক্ষায় ৯৯.৯৯ শতাংশের মত মিল পাওয়া যায়, যা মোরশেদকে শিশুটির পিতা হিসেবে নিশ্চিত করে। অপরদিকে মোজাফফরের ডিএনএ শিশুটির সঙ্গে মেলেনি।
এমতাবস্থায় তদন্ত কর্মকর্তা গত ১৭ এপ্রিল আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন, যার মাধ্যমে মোজাফফরকে মামলায় অব্যাহতি দেয়া হয় এবং প্রাথমিকভাবে মোরশেদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে মোরশেদ ফেনী জেলা কারাগারে রয়েছেন।
মোজাফফর বলেন, ‘‘অবশেষে সত্যের জয় হয়েছে। কিন্তু আমার জীবনে ক্ষতিটা ফিরে পাওয়া যাবে না — সামাজিক অপবাদ, চাকরি হারা, আর্থিক ক্ষতি সব কিছুই হয়েছে।’’
তাঁর আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, এমন ঘটনাগুলো দুর্লভ, কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে; ডিএনএ পরীক্ষায় সঠিক তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের পরশুরাম উপজেলার সাধারণ সম্পাদক মুফতি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘‘তিনি একজন মজলুম ইমাম ও তালেবে ইলম। তাকে যে মানসিক ও আর্থিক কষ্ট হয়েছে, সেটার ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং আইনগত সহায়তা করা উচিত।’’
পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আশ্রাফুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘‘পুলিশ বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করেছে। ডিএনএ রিপোর্টের পর মোজাফফরের নাম চার্জশিট থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ধরনের মিথ্যা বা ভুল অভিযোগ সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’’
এই ঘটনার সূত্র ধরে স্থানীয়রা বলছে—সত্যি বেরোলে নিরপরাধরা বাঁচবে, কিন্তু মিথ্যা অভিযোগের দরুন একজন মানুষের জীবন ও সম্মান কতটা বিধ্বস্ত হতে পারে, তা ভাবতে বাধ্য করে।
