ফেনীর পরশুরামের বক্সমাহমুদে এক কিশোরীর ধর্ষণ মামলায় ইমাম মোজাফফর আহমদ (২৫) বিনাদোষী ঘোষণা করা হয়েছে। ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষায় খুঁজে পাওয়া গেছে বাস্তব আসল অভিযুক্তের ডিএনএ — কিশোরীর বড়ভাই মোরশেদের — ফলে মোজাফফরকে ওই মামলায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে উঠে আসে দীর্ঘ তদন্ত ও একাধিক ফরেনসিক পরীক্ষার পর। অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর। মামলার প্রাথমিক পর্যায়ে মক্তব শিক্ষক ও ইমাম হিসেবে পরিচিত মোজাফফরকে অভিযুক্ত করা হয়। তিনি শুরু থেকেই নিজেকে সংযুক্ত না বলে দাবি করলেও গ্রামে ও সামাজিকভাবে তার ওপর নানান অপবাদ ছড়ায় এবং এক মাস দুই দিন জেলের নাজেহাল জীবন কাটাতে হয় তাকে।
মোজাফফর জানিয়েছেন, এই সময় তিনি মসজিদের ইমামতির পদ ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারান। সামাজিক কলঙ্ক, মানহানি ও মামলার খরচ আঞ্জাম দিতে বাড়ির পাশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা—৫ শতক—বিক্রি করে দিতে হয়। তিনি বলেন, “অবশেষে সত্যের জয় হয়েছে। আমি সামাজিক ও পারিবারিকভাবে অত্যধিক হেনস্তার শিকার হয়েছি। আমি কারাভোগ, সামাজিক মর্যাদাহানি ও আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবি করছি।”
ফরেনসিক পরীক্ষার প্রথম দফায় কিশোরীর সংরক্ষিত ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষা করে কোনো বীর্যের উপাদান শনাক্ত করা যায়নি। এরপর তদন্ত আরও গভীর করে পুলিশ। কিশোরীর ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে সে এক পর্যায়ে স্বীকার করে যে তাকে ধর্ষণ করেছে তারই সহোদর ভাই মোরশেদ। তদন্তের এক পর্যায়ে ২০২৫ সালের ১৯ মে মোরশেদ (২২) গ্রেপ্তার হন এবং পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন; পরদিন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দেন।
পরে কিশোরী, তার সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু কন্যা এবং অভিযুক্ত মোরশেদের নমুনা ঢাকার ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হলে ২০২৫ সালের ৯ আগস্ট প্রদত্ত ডিএনএ রিপোর্টে বলা হয়—শিশুটির পিতা হিসেবে মোরশেদের ডিএনএ নমুনা ৯৯.৯৯ শতাংশ মিলেছে। মোজাফফরের ডিএনএ শিশুটির সঙ্গে মিলেনি। এ রিপোর্টের ভিত্তিতেই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে মোজাফফরের নাম অভিযোগপত্র থেকে প্রত্যাহার করে মোরশেদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। গ্রেপ্তারের পর থেকে মোরশেদ ফেনী জেলা কারাগারে রয়েছেন।
পুলিশ ও তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, কিশোরী ২০১৯ সালে মক্তবের পাঠ শেষ করার পর বাড়িতে থাকা অবস্থায় পাঁচ বছর না যাওয়া পর্যন্ত পরে অন্তঃসত্ত্বা হন এবং পরবর্তীতে সন্তান প্রসব করেন। ঘটনার প্রথম দফায় পরিবারের চাপ কিংবা প্রয়োজনে প্রকৃত দোষীর ওপর নজর রাখতে গিয়ে মোজাফফরের ওপর অভিযোগ চাপানো হয়—যার ফলে এক নির্দোষ মানুষ সমাজে, কাজ ও সংসারে বড় ক্ষতির মুখে পড়েন।
মোজাফফরের আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, “এ ধরনের ঘটনা বিরল হলেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নির্দোষকে ফাঁসানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষায় সত্য উদঘাটিত হয়েছে।”
জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের পরশুরাম উপজেলার সাধারণ সম্পাদক মুফতি আমিনুল ইসলাম বলেন, “তিনি জেনুইন একটি মজলুম ইমাম ও তালেবে ইলম। ক্ষতিগ্রস্ত ইমামের ক্ষতিপূরণ কে দেবে? তাকে মানসিকভাবে সাহসসঞ্চয় করার পাশাপাশি আর্থিক ও আইনগত সহায়তা দেওয়া উচিত।”
পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশ্রাফুল ইসলাম বলেন, “মামলাটি নিয়ে পুলিশ গভীরভাবে তদন্ত করেছে। ডিএনএ রিপোর্টের আলোকে তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ দেখে অভিযোগপত্র সংশোধন করা হয়েছে। নিরপরাধ একজনকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে—এ ধরনের ঘটনা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।”
কাহিনীর এই মোড় অত্যন্ত স্পর্শকাতর—একদিকে একটি কিশোরী ও তার শিশু সঠিক বিচার ও সুরক্ষা পাওয়ার দাবি, অন্যদিকে একজন নিরপরাধ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক কলঙ্ক, কর্মহীনতা ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। বিচারপ্রক্রিয়া ও ফরেনসিক পরীক্ষার স্বচ্ছতা এই ধরনের ভুল বুঝাবুঝি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে তদন্তকারীরা মন্তব্য করেছেন।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন
