খুলনা অঞ্চলের ইজারা দেয়া ও বেসরকারি পাটকলগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে, এর মূল কারণ হলো কাঁচা পাটের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি। সম্প্রতি কাঁচা পাটের দাম দ্রুত বেড়ে গেলে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যায়, যার ফলে অনেক মিল তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন, পাশাপাশি মিলগুলো আর্থিক লোকসানে সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
দৌলতপুর এলাকার দৌলতপুর জুট মিলের উৎপাদন প্রায় দেড় মাস যাবত বন্ধ রয়েছে। শ্রমিকরা প্রতিদিন মিলের সামনে এসে অপেক্ষা করছেন, কিন্তু কাঁচা পাটের সংকটের কারণে তারা কাজে যোগ দিতে পারছেন না। একই পরিস্থিতি দেশের অন্যান্য মিলগুলোতেও। কিছু কিছু মিল সীমিত আকারে কাজ চালিয়ে গেলেও বেশিরভাগই কার্যক্রম বন্ধ বা স্থবির। শ্রমিকরা মনে করছেন, এই অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে তারা স্থায়ীভাবে কাজ হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন।
দৌলতপুর জুট মিলের শ্রমিক আসাদুজ্জামান বলেন, পঁচিশ দিন ধরে তিনি মিলের কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। কাঁচা পাটের অভাবে মিল চালানো সম্ভব হচ্ছে না, যদি এ অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলে যায়, তাহলে তিনি হয়তো নতুন কোনো কাজ খুঁজে পাবেন না। অন্য শ্রমিক হাবিবুল্লাহ জানান, আগে মিলের কাজে প্রতিদিন শ্রমিকরা ২ টাকা আয় করতেন, এ বছরের প্রথম দিকে মিল চালু ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেড় মাস ধরে তারা কাজ করছেন না, আর মালিক যদি নিজেদের বেঁচে থাকেন, তবে শ্রমিকদের বাঁচানোর আশা কতটা! তিনি বলেন, কাঁচা পাটের এই সংকট দূর করতে দ্রুত সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
মিল মালিকদের মতে, মৌসুমের শুরুতে কাঁচা পাটের মূল্য মণপ্রতি প্রায় ৩২০০ টাকা ছিল, বর্তমানে তা দরে পৌঁছেছে ৫২০০ টাকা, অর্থাৎ দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়েছে। উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, কিন্তু বাজারে পণ্যের দাম বাড়েনি। এতে উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারাচ্ছেন। দৌলতপুর জুট মিলের উৎপাদন কর্মকর্তা মোঃ ইসরাফিল মোল্লা জানান, বেশি দামে পাট কিনে মিল চালানো এখন অসম্ভব। আগে যেখানে ৩২০০ টাকায় পাট কিনে প্রতিটি বস্তা বিক্রি করতেন ৮০ টাকায়, সেখানে এখন পাটের দাম ৫২০০ টাকা, এবং উৎপাদন খরচ এক বস্তার জন্য ১২০ টাকারও বেশি। তবে বিক্রির মূল্য মানছেন না, ফলে মিলে কার্যক্রম বন্ধ।
শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বছরের কাঁচা পাটের উৎপাদন গত বছরের মতোই ছিল, কিন্তু দাম বৃদ্ধি করে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট রচনায় সক্রিয় হয়েছেন। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইলে মোট পাটের উৎপাদন প্রায় সমান। তবে ব্যবসায়ীরা মজুত করে বাজার অস্থিতিশীল করে তোলায় দাম বাড়ছে।
বাংলাদেশ জুট মিল এ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক মোঃ জহির উদ্দিন বলেন, সরকার যেন বাজারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, ভর্তুকি বাড়িয়ে এবং তদারকি জোরদার করে এই সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেয়। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা কাঁচা পাট মজুত করে রেখেছে, ফলে বাজার অস্থিতিশীল এবং মূল্য বাড়ছে। ব্যাংক ঋণের জন্য যেখানে সুবিধা কম, সেখানে সরকারের উদ্যোগ বাধ্যতামূলক বলে মনে করছেন তারা।
পাট অধিদফতর থেকে জানানো হয়, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নিয়মিত নজরদারি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। খুলনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সরজিত সরকার বলেন, একজন আড়তদার বা ডিলার মাসে সর্বোচ্চ ৫০০ মণ পাট মজুত রাখতে পারবেন। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, এবং বেশি মজুত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে, যার ফলে দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তারা।
খুলনা অঞ্চলে ইজারাকৃত ও বেসরকারি মিল মিলিয়ে মোট ২০টি পাটকল রয়েছে, যেখানে প্রতি মাসে প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন পাটপণ্য উৎপাদিত হয়। এর বেশির ভাগই বিদেশে রফতানি হয়। কিন্তু বর্তমান সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন ও রফতানিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আপশোস প্রকাশ করেছেন।
