দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান খালেদা জিয়ানের মৃত্যুতে রাজধানীর প্রতিটি কোলাহল যেন শোকের মাতমে পরিণত হয়। তার জানাজায় অংশ নিতে লাখো মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজধানীর মানিকমিয়া এভিনিউসহ আশপাশের এলাকাগুলো জনসমুদ্রের মধ্যে রূপান্তরিত হয়, যেখানে এক দিকে চোখ যায়, অন্য দিকে মানুষের ঢল। দলমত-নির্বিশেষে শোকার্ত মানুষের দেখা মেলে, যারা তার বিদায় জানাতে এসেছেন। প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সবাই এককথায় বলেছেন—আর কখনো দেশের ইতিহাসে এত বড় মুক্তির ঝড়ের মতো জানাজা অনুষ্ঠিত হয়নি। এই জানাজাকে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বড় জানাজা হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
বুধবার দুপুর ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খালেদা জিয়ানের জানাজা হওয়ার কথা থাকলেও বিকেল ৩টায় সেটা শুরু হয়। আগের দিন থেকেই মানিকমিয়া এভিনিউ ও এর আশপাশের রাস্তার মোড়ে মোড়ে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়। জনতার বিশাল ঢল জাহাঙ্গীর গেট, মিরপুর রোড, ফার্মগেট ছাড়িয়ে কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর এবং মগবাজার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। মাইক থেকে উচ্চস্বরে প্রচার করা হয়, আর দর্শনার্থীরা রাস্তায় কাতারবন্দি হয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। কেউ বাসায়, কেউ ফুটওভার ব্রিজে, যেখানে যেখানে জায়গা পান সেখানে দাঁড়ান। এই জানাজায় অংশ নেন শুধু বিএনপি’র নেতাকর্মীরাই নন, সাধারণ মানুষ, চাকরিজীবী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, রিকশাচালক, প্রত্যেক শ্রেণী-পেশার মানুষ। এর পাশাপাশি সংসদ ভবন এলাকার গাছ, ফুটপাথ এমনকি কাছাকাছি ভবনের ছাদগুলোতেও ব্যাপক লোক সমাবেশ ছিল।
প্রিয় নেত্রী খালেদা জিয়ার বিদায়ে অংশ নিতে ভোর থেকে তীব্র শীতের মধ্যেও মানুষ ছড়িয়ে পড়েন। তারা মানিকমিয়া এভিনিউ, দলের কার্যালয়, এভারকেয়ারসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করেন। সকাল থেকে দিনভর তারাও আসতে থাকেন আর বাড়তে থাকে জনস্রোত। জানাজায় অংশ নেওয়া মুসল্লিরা বলেন, এই জানাজা ইতিহাসের অন্যতম বিরল ঘটনা হয়ে থাকবে। শেষ বিদায় হিসেবে এত মানুষের উপস্থিতি খুব কমই দেখা যায়। অনেকের মুখে একটাই কথা—অতি সহজে জীবনধারায় পাওয়া যায় না এই ভাষা, এই অনুভূতি।
বিশেষ করে ক্ষোভ-আকাশে বাতাসে, আবেগে ভরা এই আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, সৌদি আরবসহ মোট ৩২ দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন। ভারত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ভূটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, নেপালের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং পাকিস্তানের স্পিকারসহ অনেক বিদেশিপ্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। তারা এই অনন্য মুহূর্তে বাংলাদেশের মানুষের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ভাষা বুঝতে পেরেছেন।
খালেদা জিয়ার জানাজায় নারীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়। জানাজার মূল আসরে নারীদের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকলেও আশপাশে হাজারো নারী অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানাচ্ছেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রীকে।
বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। এ সময় সেনাবাহিনী তাদের গার্ড অব অনার প্রদান করে। দাফনের পর মরহুমার রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। এই মোনাজাতে উপস্থিত ছিল হৃদয় বিদারক অনেক দৃশ্য; নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের গগণবিদারী কাঁদো কাঁদো দৃশ্য পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির এক অধ্যায় সমাপ্ত হয়, যা সবসময় স্মরণ থাকবে।
Leave a Reply