আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে যাত্রা শুরু করা এমভি হন্ডিয়াস নামের একটি বিলাসবহুল ক্রুজশিপে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ঘটনা বিশ্ব স্বাস্থ্য প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছে। জাহাজে বা জাহাজে ভ্রমণের পর অন্তত তিনজন যাত্রী মারা গেছেন এবং ভাইরাসের সংস্পর্শে আসা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ওশেনওয়াইড এক্সপেডিশনস পরিচালিত এমভি হন্ডিয়াস ১ এপ্রিল উশুয়াইয়া থেকে যাত্রা করেছিল। জাহাজটিতে প্রথমদিকে প্রায় ১৫০ জন যাত্রী ও ক্রু ছিলেন, তারা ছিল বিশ্বের প্রায় ২৮টি দেশের নাগরিক—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, ফিলিপিন্স, রাশিয়া ও ইউরোপের অন্যান্য দেশসহ।
১১ এপ্রিল একজন ডাচ ব্যক্তি জাহাজেই মারা যান; নিহতের মৃত্যুর কারণ তখন অনিশ্চিত ছিল। দুই সপ্তাহ পর, ২৪ এপ্রিল সেই ব্যক্তির স্ত্রীকে সেন্ট হেলেনা থেকে নামিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে তিনি মারা যান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরে নিশ্চিত করেছে যে ৬৯ বছর বয়সী ওই নারী হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন।
এরপর ২ মে জাহাজের আরও একজন যাত্রী—একজন জার্মান নারী—মারা যাওয়ায় মোট মৃতের সংখ্যা তিনে পৌঁছায়।
দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বুধবার বলেছে, নমুনা পরিক্ষায় ভাইরাসটির ‘অ্যান্ডিস’ স্ট্রেইন শনাক্ত করা হয়েছে, যা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর ক্ষমতার জন্য পরিচিত। এই নৈসর্গিক ভ্রমণে অংশ নেওয়া এবং পরে নিজ দেশে ফিরে যাওয়া অনেক যাত্রীর সংস্পর্শে থাকার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে, জাহাজ থেকে নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের সময় একজন আমেরিকান ও একজন ফরাসি নাগরিকের শরীরে হান্টাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, প্রত্যাবাসন ফ্লাইটে একজন মার্কিন নাগরিকের মাঝেমধ্যে মৃদু উপসর্গ দেখা গেছে; উভয় ব্যক্তিকেই অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বায়োকন্টেইনমেন্ট ইউনিটে রাখা হয়েছে।
ফরাসি স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট জানিয়েছেন, প্যারিসে ওই নারী বর্তমানে আইসোলেশনে আছেন এবং তার শারীরিক অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। তার সংস্পর্শে থাকা ২২ জনকে শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
সেন্ট হেলেনায় যাত্রাবিরতি করার পর জাহাজ থেকে সাতজন ব্রিটিশসহ মোট ৩০ জন যাত্রী নেমে গিয়েছিলেন; জাহাজের অপারেটর জানিয়েছে, তাদের সকলের সঙ্গেই যোগাযোগ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে যে নেদারল্যান্ডস থেকে দুইজন সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এমভি হন্ডিয়াসে যোগ দেওয়ার জন্য আসছেন এবং কেপ ভার্দেতে জাহাজ থামার পর সম্ভব হলে তারা ফের জাহাজে উঠবেন।
এমভি হন্ডিয়াস তিন দিন কেপ ভার্দে নোঙর করার পর এখন স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে যাত্রা করছে।
হান্টাভাইরাস কী— সংক্ষেপে: হান্টাভাইরাস সাধারণত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর শরীরে বসবাস করে। ইঁদুরের প্রস্রাব, মল বা লালা শুকিয়ে বাতাসে মিশে গেলে ঐ কণাগুলো শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটায়। বিরলভাবে ইঁদুরের কামড় বা আঁচড় দিয়েও ভাইরাস ছড়াতে পারে।
এই ভাইরাস থেকে দুটি প্রধান রোগ হতে পারে। একদিকে হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম (HPS) — যা শুরুতে ক্লান্তি, জ্বর ও পেশিতে ব্যথা দিয়ে শুরু করে এবং দ্রুত শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসজনিত জটিলতা তৈরি করতে পারে; সিডিসি অনুযায়ী এমন শ্বাসকষ্টজক্ক রোগীর মৃত্যু হার প্রায় ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম (HFRS) মূলত কিডনি নষ্ট করে, যার ফলে নিম্ন রক্তচাপ, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ও কিডনি ব্যর্থতার মতো জটিলতা দেখা দেয়।
ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে নজর কেড়েছে কারণ ক্রুজশিপে উপস্থিত বহু দেশের নাগরিক দ্রুত ফিরেছেন বা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন; তাই সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত সনাক্তকরণ, পর্যবেক্ষণ এবং অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিবিসি।
