ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া ২৬ বছর বয়সী হিশাম সম্পর্কে নতুন করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় তদন্তকারীরা তাঁর অতীত আচরণ ও পূর্বের অভিযোগগুলো এখন তদন্তের মূল ফোকাসে রেখেছেন।
হিলসবোরো কাউন্টি ডেপুটি চিফ জোসেফ মাউরার জানিয়েছেন, লিমন নামের শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় হিশামকে একাধিক অভিযোগে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ তালিকায় রয়েছে মৃত্যুর খবর চেপে রাখা, মৃতদেহ অবৈধভাবে সরানো, আলামত নষ্ট করা, ভুলভালভাবে কারাবন্দি হিসেবে দেখানো এবং পারিবারিক সহিংসতা ও শারীরিক আঘাত দেয়া। ময়নাতদন্তের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে লিমনের মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ধারণ করা হবে বলে তদন্তকারী জানান।
সংবাদমাধ্যম নিউযউইকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে হিশাম মার্কিন নাগরিক এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার সাবেক ছাত্র; ২০২১ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত তিনি ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক পড়াশোনা করলেও হত্যাকাণ্ডের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকাভুক্ত ছিলেন না। স্থানীয় আদালত ও শেরিফ অফিসের রেকর্ডে তার বিরুদ্ধে পূর্বে সহিংসতার সাতাসম্পর্কিত অভিযোগ উঠেছে।
আদালতের নথিতে দেখা যায়, ২০২৩ সালের মে ও সেপ্টেম্বর মাসে হিশামের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ ছিল। একই সময়ে তার নামে একটি জনশূন্য বাড়ি থেকে চুরির অভিযোগও করা হয়েছিল, যা তখন তুলনামূলকভাবে হালকা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। পরিবারের একাধিক সদস্যও তাঁর আচরণ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন; তাদের মধ্যে কেউ কেউ হিশামের বিরুদ্ধে দুইটি পারিবারিক সুরক্ষা নিষেধাজ্ঞার জন্য আবেদন করেন এবং আদালত থেকে একটি আবেদন মঞ্জুরও হয়। এছাড়া তার বিরুদ্ধে নানা ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের রেকর্ডও রয়েছে।
লিমনের লাশ উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের ঘটনাটি ছিল স্থানীয় পুলিশের জন্য নাটকীয়। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) ট্যাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড সেতু থেকে লিমনের ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ হিশামের পরিবারের বাড়ি থেকে একটি পারিবারিক সহিংসতার ফোন পায়। পুলিশ সেখানে গেলে হিশাম বাড়ির ভেতর নিজেকে অবরুদ্ধ করে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের বিশেষ সোয়াট টিমকে ডেকে আনা হয় এবং বেশ কিছু সময়ের নাছাছড়া ও উত্তেজনার পর সোয়াট টিমের চাপে অবশেষে হিশাম আত্মসমর্পণ করেন।
এ ঘটনার সঙ্গে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির নিখোঁজ থাকা এখনো একটি বড় প্রশ্নছাঁয়া। বিশ্ববিদ্যালয়সূত্র ও পরিবারের পক্ষ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রায় এক সপ্তাহ নিখোঁজ থাকার পর নিশ্চিত করা হয়েছে যে জামিল লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি—দুইজনই প্রাণ হারিয়েছেন। লিমনের ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার করা হয় এবং পরে শনিবার (২৫ এপ্রিল) বৃষ্টির মৃত্যুও তার পরিবার কর্তৃক নিশ্চিত করা হয়। বৃষ্টির ভাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, তার বোনও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
এই ঘটনার ফলে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি ও ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার ছাত্রদের মধ্যে গভীর শোক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনার সঠিক কারণ ও প্রেক্ষাপট উদঘাটনে তৎপর রয়েছেন। তদন্তকারীরা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, সিসিটিভি ফুটেজ ও সম্ভাব্য সাক্ষীর বৌদ্ধিক বিবৃতির ওপর ভর করে ঘটনাটির তদন্ত চালাচ্ছেন।
প্রতিবাদি ও অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো বিচারিক সিদ্ধান্ত এখনই নেওয়া হয়নি; হিশামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুযায়ী তদন্ত ও বিচার চলছে। তদন্ত সংক্রান্ত নতুন কোনো তথ্য প্রকাশ হলে কর্তৃপক্ষ তা পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করবে এবং সমাজকেও জানানো হবে।
