ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় ‘আশার আলো’, পাকিস্তান মধ্যস্থতা

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান তীব্র উত্তেজনা কমানো ও অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নতুন করে জেগে উঠেছে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা আবারও শুরু হতে পারে—এই আশা তৈরি করেছে এবং তার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা নজর কাড়ছে।

গত শনিবার ইসলামাবাদে সরাসরি বৈঠকে বসেন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা; সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর এটি বিরল এক সরাসরি সংলাপ ছিল। তবে ওই বৈঠক কোনো চূড়ান্ত সমাধান ছাড়া শেষ হয় এবং দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা নিজেদের দেশে ফিরে যান।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, চলতি সপ্তাহেই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আবারও সংলাপ শুরু হতে পারে। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমার মনে হয় এটি প্রায় শেষ। হ্যাঁ, আমি এটিকে শেষ হওয়ার খুব কাছাকাছি বলেই মনে করি।” হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদেরকেও তিনি বলেছেন, আগামী দুই দিনের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা আছে এবং পাকিস্তানকে যথার্থ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ট্রাম্প আরো বলেছেন, “ফিল্ড মার্শাল দারুণ কাজ করছেন। তিনি অসাধারণ—এ কারণে আমাদের সেখানে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।” এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায় পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের তৎপরতা ও সংযোগই মধ্যস্থতার মূল চালিকা শক্তি হিসেবে ধরা হচ্ছে।

পাকিস্তানের এই উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। দুই দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক থাকা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা আলোচনার এই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিচ্ছেন।

আলোচনার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্ক সফরে গেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, সৌদি আরব ও কাতারে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হবে এবং তুরস্কে অনুষ্ঠিত আন্তালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামে তিনি অংশ নেবেন; সেখানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানসহ অন্যান্য বিশ্বনেতাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করার কথা আছে। তার সঙ্গে উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দারও রয়েছেন।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে ইতিমধ্যে তেহরানে পৌঁছেছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং দ্বিতীয় দফা আলোচনার সমন্বয়ে তাঁর নেতৃত্বে এই সফর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনা হওয়া সম্ভব।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, প্রথম দফার আলোচনার পরও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, ইরান তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরমাণু সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যেতে চায়, তবে এ কর্মসূচির ধরন ও মাত্রা নিয়ে আলোচনার জায়গা আছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে দুই পক্ষকেই কঠোর কিছু বলে ছাড় দিতে হতে পারে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচক ডেভিড মিলার বলেছেন যে দীর্ঘসময় ধরে ফলপ্রসূ আলোচনায় অভাব থাকায় কৌশলগতভাবে ইরান কিছুটা এগিয়ে আছে এবং তারা তাড়াহুড়ো করে ছাড় দেবে না। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ত্রিতা পারসি বলেছেন, প্রেক্ষাপট বদলেছে; সামরিক হুমকির পরও ইরান নতিস্বীকার করেনি, তাই যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনৈতিক আপসের পথ অবলম্বন করতে হবে। ইসলামাবাদভিত্তিক বিশ্লেষক জাহিদ হুসাইন দ্বিতীয় রাউন্ডের আলোচনা সম্ভাবনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন এবং মনে করছেন এটি আগামী সপ্তাহগুলোতে উত্তেজনা প্রশমনে সহায়ক হতে পারে।

পাকিস্তানের সাবেক নৌকমোডর ও কূটনীতিক মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ আল জাজিরার মতে, প্রথম দফায় বড় অগ্রগতি আশা করা অবাস্তব ছিল, তবে দুই পক্ষকে মুখোমুখি করে বসানোই একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য; দ্বিতীয় দফার উদ্যোগ এই কূটনীতিকে এখনও সক্রিয় ও ফলপ্রসূ করার ইঙ্গিত দেয়।

বর্তমানে পরিস্থিতি অনিশ্চিত হলেও কূটনীতির চেষ্টাগুলো চলমান থাকাই উৎসাহব্যাঞ্জক। ইসলামাবাদে যদি আলোচনার দ্বিতীয় দফা হয় এবং তা থেকে বাস্তবসম্মত সমাধানের সূত্রপাত ঘটে, তবে অঞ্চলকে ঝুঁকি থেকে বাঁচানোর দিক থেকে তা বড় এক ইতিবাচক অগ্রগতি হবে।