গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর নেপালের ইতিহাসে এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। রাজধানী কাঠমান্ডুর মৈতিঘর মণ্ডলা থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়া ‘জেনারেশন জেড’ বা জেন-জি আন্দোলনের প্রতিবাদে সেদিন রক্তঝরা হয়েছিল। বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিষয়টি প্রকাশ করেছে, যেখানে বলা হয়েছে, নিরস্ত্র ও পলায়নরত তরুণদের ওপর সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেয় পুলিশ প্রধানের সামনেই কর্তৃপক্ষ।
বিবিসির বিশেষ সূত্র মতে, পুলিশের গোপন ‘লগ বুক’ ও অভ্যন্তরীণ নথিপত্রে দেখা গেছে, ৮ সেপ্টেম্বর বিকেল ১২টা ৩০ মিনিটে কারফিউ জারির পর মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে রেডিও বার্তায় একটি নির্দেশ দেওয়া হয়। এই নির্দেশ দেতা ঘোষণা করেন ‘পিটার ১’ কল সাইন ব্যবহারকারী পুলিশ কর্মকর্তা, যার সূত্রে জানা যায়, তিনি নেপালের আশির্ধ্ণতর পুলিশ মহাপরিদর্শক চন্দ্র কুবের খাপুং।
নথিপত্রে আরও বলা হয়েছে, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বারবার প্রাণনাশক গোলার অনুমতি চেয়ে রেডিওর মাধ্যমে নির্দেশের জন্য আবেদন করেন। তখনই ‘পিটার ১’ থেকে নির্দেশ আসে, ‘কারফিউ জারি হয়েছে, পর্যাপ্ত অনুমতি প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন অনুযায়ী বল প্রয়োগ করুন।’ এই পর্যায়ে শুরু হয় নির্বিচার গুলির বর্বরতা।
অত্যন্ত দুঃখজনক হলো, ওই দিন নিহত ১৯ জনের মধ্যে সবচেয়ে করুণ কাহিনি হলো ১৭ বছর বয়সী শ্রীয়াম চৌলাগাঁইয়ের। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে জানা গেছে, সেদিন সে কোনও সহিংসতায় যুক্ত ছিল না। স্কুলের ব্যাগ নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল থেকে সরে আসছিল, তখনই তার মাথার পিছনে গুলি লেগে সে ঘটনাস্থলেই নিহত হয়।
শ্রীয়ামের মা-বাবা জানায়, তার ছেলে রাজনীতির অনেক সচেতন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। একবার তাদের বলেছিল, ‘আমরা তো ছোট, পুলিশ আমাদের ওপর গুলি চালাবে না।’ কিন্তু তার বিশ্বাসের মূল্য দিতে হল প্রাণ দিয়ে।
নেপালের এই আন্দোলন মূলত কোনো প্রাচীন রাজনৈতিক দলের আয়োজিত নয়। বিশ্লেষকেরা এটিকে বলছেন ‘ডিজিটাল বিপ্লব’। আগস্ট থেকেই তরুণেরা অনলাইনে ‘নেপো বেবি’ বা অভিজাত পরিবারের সন্তানদের বিরুদ্ধে আভিজাত্য বিরোধী আন্দোলন শুরু করে। সরকার যখন ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম বন্ধ করে দিল, তখন তারা গেমিং প্ল্যাটফর্ম ডিসকর্ডে সংগঠিত হয়। ‘ইউথ অ্যাগেইনস্ট করাপশন’ নামে এই সার্ভারে বিশাল সমাবেশ ও পরিকল্পনা চলছিল।
অন্য এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম গোপন রেখেই বলেন, তারা তরুণ প্রজন্মের এই ডিজিটাল সংগঠনের ক্ষমতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজান ছিল। সেখানে উপস্থিতির সংখ্যা ছিল আনুমানিক ৩০,০০০।
তদন্তের সময় আরও খুঁজে পাওয়া যায়, পুলিশ কেবল রাস্তা থেকেই নয়, সংসদ ভবনের উঁচু প্রাচীর ও গেটহাউস থেকেও বিক্ষোভকারীদের নিশানা করে গুলি চালিয়েছে। ২টা ২১ মিনিটে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সংসদ ভবনের প্রাচীরের আড়াল থেকে ধোঁয়া বের হতে, যা স্পষ্ট করে দেয় টার্গেট করে গুলি করা হচ্ছিল। সেই গুলিতে প্রাণ হারান ২৪ বছরের যুবক যোগেন্দ্র নিউপানে।
৮ সেপ্টেম্বরের এই নিষ্ঠুরতার পরিপ্রেক্ষিতে, নেপাল রাজনীতিতে গভীর এক ঝড় ওঠে। পরের দিন, ৯ সেপ্টেম্বর, ক্ষুব্ধ জনতা দেশব্যাপী থানায় ও সরকারি ভবনে আগুন লাগায়। পরিস্থিতি আর সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়লে, প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এর মধ্যে, দুই দিনে সারা দেশে নিহত হন মোট ৭৭ জন।
আগামী ৫ মার্চ নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে, ৮ সেপ্টেম্বরের এই হত্যাকাণ্ডের দায় কেউ গ্রেপ্তার বা প্রাসঙ্গিক আইনি ব্যবস্থা নেননি। সাবেক আইজিপি খাপুং অবসরে গিয়ে নিস্তব্ধতা পালন করছেন। একইভাবে, তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের আরও কিছু কর্মকর্তারা দায় এড়ানোর জন্য লুকোচুরি খেলায় লিপ্ত।
এত হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একটি পাবলিক ইনকোয়ারি কমিশন গঠন হলেও তার প্রতিবেদন আজো প্রকাশ পায়নি। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, রাজনৈতিক সুবিধার জন্য এই হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
শহীদ শ্রীয়ামের মা আজও দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন, মনে করেন, হয়তো স্কুলের ইউনিফর্ম পরা তার ছেলে ব্যাগ নিয়ে ফিরে আসবে। তরুণ সমাজ এই বিচারহীনতার বিরুদ্ধে আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে, তারা বলছেন, এই জুলুম আর চলতে দেওয়া হবে না।
