পাকিস্তানের পাঞ্জাবে ৮ মাসে বিচারবহির্ভূতভাবে ৯২৪ জনের হত্যা

গত নভেম্বরের এক দিন পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা বাহাওয়ালপুরে ভয়ঙ্কর এক ঘটনা ঘটে। স্থানীয় পুলিশ বিভাগ ক্রাইম কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্টের (সিসিডি) একটি সশস্ত্র টিম বাড়িতে ঢুকে জুবাইদা বিবি ও তার পরিবারকে মারাত্মকভাবে আক্রমণ করে। তারা পরিবারের সদস্যদের মোবাইল ফোন, ঘরে থাকা নগদ অর্থ, অলংকার লুট করে নেয় এবং একই সঙ্গে তিন ছেলে ও দুই জামাতাকে ধরে নিয়ে যায়।

চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পাঞ্জাবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত ব্যক্তিরা হলেন পরিবারের তিন ছেলে ইমরান (২৫), ইরফান (২৩) এবং আদনান (১৮)। পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো স্বতন্ত্রভাবে ঘটনার তদন্ত চালাচ্ছে। অপরাধের অভিযোগে জুবাইদা বিবি ও তার স্বামী আবদুল জব্বার আদালতে গিয়েছিলেন, কিন্তু পুলিশ তাদের হুমকি দেয় যে অভিযোগ প্রত্যাহার না করলে পরিবারের সব সদস্যকে হত্যা করা হবে। এই ভয়ে তারা নিরীহভাবে অভিযোগ তুলে নেন।

জুবাইদা বিবির লিখিত বক্তব্যে বলেন, “তারা ঝড়ের মতো আমাদের বাড়িতে ঢুকে সব কিছু নিয়ে যায়। তারা ছেলেদের ফেরত দেওয়ার জন্য লাহোর পর্যন্ত গিয়েও ব্যর্থ হন। পরের দিন তাঁদের লাশ পাওয়া যায়।“ এই ঘটনায় দেশব্যাপী ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে পাকিস্তানের বৃহত্তম মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অব পাকিস্তান (এইচআরসিপি) এই ঘটনা ফাইলে রেকর্ড করে। সংস্থার দাবি, জুবাইদা-জব্বার দম্পতি ছাড়াও বহু পরিবার ভয়ংকর এই পুলিশি অভিযান ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে।

প্রতিবেদনটি আরও জানায়, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে গঠিত ‘সিসিডি’ বিভাগটি মূলত অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য থাকলেও, বাস্তবতা যেন আবার অন্য গল্প বলে। এই সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ গত আট মাসে, পাঞ্জাব প্রদেশে এই বাহিনী ৬৭০টি ‘অভিযান’ পরিচালনা করেছে, যার ফলে ৯২৪ জন মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এই সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে বেশি, যা দেশটির মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।

সিসিডির প্রতিষ্ঠা করেন মরিয়ম নওয়াজ, যিনি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের মেয়ে। এই বাহিনী গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল গুরুতর ও সংগঠিত অপরাধ দমন করা। তবে একটি অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই বাহিনী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ও অলিখিত দায়মুক্তির সুবিধা নিয়ে দিনে দিনে অপরাধ দমন অভিযানকে ভয়ঙ্কর খুনখারাবিতে রূপান্তর করে চলেছে।

এই পরিস্থিতিতে, বিশ্লেষকদের মতে, সিসিডি আসলে ‘সামান্তরাল পুলিশ বাহিনী’ হিসেবে কাজ করছে, যা রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট দলের স্বার্থে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের নামে অপ্রতিরোধ্য হত্যা চালাচ্ছে। মানবাধিকার কর্মীরা এই অবস্থা উদ্বেগজনক বলছে, কারণ এটি দেশের আইনপ্রথার পরিপন্থী এবং পুলিশি আঘাতের ভয়াবহতা বাড়িয়ে তুলছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ৬০ বছরের মধ্যে এই ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যা অনেক গভীর ভয়ের সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ সালে, পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশে যৌথভাবে ৩৪১টি এই ধরনের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলেও, ২০২৫ সালে মাত্র আট মাসে এই সংখ্যা দেড়গুণেরও বেশি, যা উদ্বেগজনক ও ভাবনার বিষয়।