রাত পোহালেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটের প্রথম দফা শুরু হচ্ছে। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রাজ্যের ১৬টি জেলায় ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে। বাকি ১৪২টি আসনে দ্বিতীয় দফার ভোট হবে ২৯ এপ্রিল — মোট ২৯৪টি আসনের লড়াইতে রাজনৈতিক ছকে তুমুল টক্কর প্রদর্শিত হবে।
এই নির্বাচন কোথাও ক্ষমতা ধরে রাখার য鬪, কোথাও ক্ষমতা দখলের লড়াই, আবার কোথাও রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম—সব মিলিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। ফলাফল কে কী রকম করে টেনে আনবে, তা নিয়ে চলছে প্রচুর জল্পনা; কারণ পশ্চিমবঙ্গের ভোটে কখনো ইস্যু নির্ভর, কখনো প্রার্থী-নির্ভর, আবার কখনো সম্পূর্ণ আলাদা সমীকরণ কাজ করে। এ বারও রাজ্যের পলিটিক সোনালী কেন্দ্রে দাঁড় করিয়ে রেখেছে কয়েকজন প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রেই নিজের উপস্থিতি রূপক—দলের নেতা-কর্মীরাও তাকে ‘এক ও অদ্বিতীয়’ বলে অভিহিত করেন। ২০১১ সালে বাম শাসন কুড়িয়েছে তিনি, এরপর থেকে বারবার ক্ষমতায় রয়েছেন। একজন জনসংযোগে পারদর্শী নেত্রী হিসেবে তার আবেদন এখনো কার্যকর: নারী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দীর্ঘ কার্যকাল, সংগ্রামী ভাবমূর্তি এবং বিস্তৃত জনসংযোগ তাকে শক্ত করে রাখে।
তবে তার সরকারের বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে—শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ দুর্নীতি, পৌরভিত্তিক নিয়োগ বিরোধ, রেশন দুর্নীতি সহ বিভিন্ন ইস্যু জাতীয় শিরোনামে এসেছে। কিছু প্রভাবশালী নেতা—মন্ত্রী সম্বন্ধে মামলা-সংক্রান্ত খবরও দলের ভাবমূর্তিকে কাঁপাতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। তবে লক্ষ্মীভান্ডার, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী ও যুবসাথীর মতো সামাজিক প্রকল্প আসন্ন ভোটে তৃণমূলের পক্ষে ভাবমূর্তি গড়তে ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া রাজ্যের নারী ও মুসলমান ভোট ব্যাংকও তৃণমূলের জন্য বড় সমর্থন হিসেবে বিবেচিত।
নরেন্দ্র মোদি—অমিত শাহ জুটি
বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে বড় ধরনের মনোনিবেশ করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় হেফাজতে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বহুবার রাজ্য পরিদর্শন করেছেন এবং বড় জনসভায় কেন্দ্রীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে ভোটার মন জয় করার চেষ্টা করেছেন। ‘বাঙালি অস্মিতা’, অনুপ্রবেশ, দুর্নীতি ইত্যাদি ইস্যুতে রাজনৈতিক আক্রমণ চালিয়ে তারা তৃণমূলকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
বিজেপি উল্লেখ করে যে কেন্দ্রীয় সুযোগ-সুবিধা রাজ্যে যথাযথভাবে পৌঁছছে না—এসব বিষয়ই তারা প্রচারের মূল অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। গত কয়েক বছরে রাজ্যে বিজেপির দলগত ভিত্তি শক্ত হলেও মোদিকে সামনে রেখেই পশ্চিমবঙ্গে জেতা কতটা সহজ হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। পাশাপাশি এসআইআর ও ভোটার তালিকা নিয়ে চলা বিতর্কও তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে আছে। তৃণমূলের পক্ষ থেকে বিজেপিকে ধর্মীয় মেরুকরণ ও সাংস্কৃতিক ভেদাভেদের অভিযোগে আক্রমণ করা হয়েছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়
তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে বিধানসভায় দাঁড়াননি, তবু দলের পরিকল্পনা ও সাংগঠনিক শক্তি গঠনে তার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি পার্টির রণকৌশল, প্রচার ও জমিতে কাজের ওপর নজর রাখছেন। জনমুখে তার ‘বয় নেক্সট ডোর’ ইমেজ এবং তরুণ নেতৃত্বের ভাবমূর্তির কারণে অনেকেই তাকে ভবিষ্যৎ নেতারূপে দেখেন। বিরোধীরা তাকে দুর্নীতি ও পরিবারতন্ত্রের আঙুলও তুলেছে, যা দলের সামগ্রিক ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মত রয়েছ।
শুভেন্দু অধিকারী
একসময় মমতার ঘনিষ্ঠ, বর্তমানে বিজেপির অন্যতম শক্তিশালী মুখ হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীকে দেখা যাচ্ছে। নন্দীগ্রাম থেকে তার গতিশীলতা এবং ভবানীপুরে মমতাকে প্রত্যক্ষ চ্যালেঞ্জ—এসবই তাকে রাজ্যের প্রধান বিরোধী নেতাদের একজন করেছে। পূর্ব মেদিনীপুর ও সংলগ্ন অঞ্চলে তার প্রভাব আছে; তবে তিনি যে পাঠ নিয়ে আসছেন—ধর্মীয় মেরুকরণ সংক্রান্ত অভিযোগ—তাও বিরোধীর ধরনায় রয়েছে। এসআইআর সংশ্লিষ্ট সাপ্লিমেন্টারি তালিকা ও বাদ পড়া ভোটার সমস্যা নন্দীগ্রামের মতো কিছু এলাকায় বিজেপির নেতাদের জন্য ‘অস্বস্তির’ কারণ হতে পারে।
হুমায়ুন কবীর
রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় চরিত্র নাও হোক, তবুও হুমায়ুন কবীরের দিকে বড় চোখ রয়েছে। কংগ্রেস থেকে বিজেপি, তারপর তৃণমূল—এভাবে দল বদলে শেষে তিনি ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’ গঠন করেছেন। মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদের নক্সায় মসজিদ নির্মাণ ও শিলান্যাস ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন তিনি। তার দল মসজিদ-নির্মাণ ইস্যুতে এবং মুসলিম ভোটকে টেনে নিয়ে নিজের সম্পৃক্ততা দেখাতে চেয়েছে—এজন্যই মুর্শিদাবাদের কয়েকটি আসনে তিনি প্রার্থী। তবে তার বিরুদ্ধে স্টিং অপারেশন, দলবদল ও বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে সমালোচনার জেনারেটরও বহুবার হয়েছেন। তৃণমূল বলছে তিনি মুসলিম ভোট কেটে বিজেপিকে সুবিধা করে দিচ্ছেন; বিজেপি বলেন তিনি মমতাকে সাহায্য করছেন—এই ঘরাণার জটিলতা রাজ্যের রাজনীতিতে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মত
প্রবীণ সাংবাদিক শিখা মুখার্জীর ভাষ্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুরুত্ব রাজ্যের রাজনীতিতে পশ্চাদপূর্ব—তিনি তৃণমূলের কেন্দ্রীয় ফিগার। মোদি—শাহ জুটিকে তিনি দলের বিশ্বের মুখ হিসেবে দেখেন: মোদি প্রচার চালান, শাহ কৌশল সাজান। শুভেন্দু অধিকারীকে তিনি ‘বিপর্যয়জনক’ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবেই দেখেন, এবং অভিষেককে মমতার ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। হুমায়ুন কবীরকে শিখা মুখার্জী ততটা গুরুত্ব দেননি—বলেছেন তিনি বারবার দল বদল করেছেন এবং স্থায়ী রাজনৈতিক অবস্থান নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক উজ্জ্বল রায় বলেন, মোদি-শাহরা যখন কোনো নির্বাচনে জড়ান, তখন তাদের উপস্থিতি ঐ রাজ্যেই বিশেষ গুরুত্ব পায়। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তারা প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, কিন্তু পুরোদমে জয় এনে দিতে পারবে কি না, তা সময়ই বলবে।
নির্বাচন অতি ঘন এবং সিদ্ধান্ত অনিশ্চিত। মমতা—তৃণমূলের দরকার আছে নিজের শক্তি ধরে রাখতে, বিজেপি চেষ্টা করছে মোদির মেজাজে রাজ্য দখলের; অপরদিকে ছোট দল ও স্থানীয় নেতারা নিজেরভাবে খেলতে চাইছে—এসব মিলে ভোটের ফলকে বিদ্যমান সমীকরণ কিভাবে বদলায়, তা দেখতেও উৎসুক জনগণ। রাজ্য তথা দেশের রাজনৈতিক বীভৎসতা এবং ফলাফলের প্রভাব সারা দেশে নজরকাড়া হবে।
