২০ বছর পর সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি; প্রথমবার প্রধান বিরোধী দলে জামায়াত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেসরকারি ফলাফলের আলোকেই দীর্ঘ দুই দশক পর চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। মোট ২৯৯টি আসনের মধ্যে এখন পর্যন্ত পাওয়া অপ্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থীরা ১৭৫টি আসনে জয়ী হয়েছেন।

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা এইবার ৫৬টি আসনে জয় লাভ করেছেন। আর জাতীয় নাগরিক পার্টি ৬টি ও স্বতন্ত্র এবং অন্যান্য দল মিলিয়ে ১১টি আসনে সফল হয়েছে। বাকি ৪২টি আসনের ফলাফল এখনও যাচাই প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

বড় জয়লাভে নজর কাড়ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তিনি ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে, ঢাকা-১৫ আসনে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

আইনীভাবে সরকার গঠনের জন্য ৩০০ সদস্যবিশিষ্ট সংসদের অর্ধেক চেয়ে এক সদস্য বেশি, অর্থাৎ অন্তত ১৫১টি আসনে জয় প্রয়োজন। বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী বিএনপি এককভাবে সেই সংখ্যাকে অতিক্রম করেছে বলে দলীয় পক্ষ থেকে অভিমত প্রকাশিত হয়েছে।

ইতিমধ্যে এই নির্বাচনে বিশেষ একটি দিককে ইতিহাস বলতেই হচ্ছে—জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট এবার প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পেতে যাচ্ছে। পূর্বের কয়েক দফায় জামায়াত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হলেও কখনো তারা প্রধান বিরোধী দল হিসেবে স্থান পায়নি।

বিএনপির ক্ষমতার সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বশেষ তাদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল ২০০১ সালের নির্বাচনে। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিলে ওই মেয়াদ শেষ হয়। বেগম খালেদা জিয়াই দলকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে গেছেন এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গড়া এই দলটিকে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দীর্ঘ সময়ের রাজনীতি-সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তিনি; ১৯৯৬ সালেও স্বল্প সময়ের জন্য বিএনপি সরকার গঠন করেছিল।

এই নির্বাচনে দলের নতুন নেতৃত্ব হিসেবে নজর কাড়া ব্যক্তিত্ব তারেক রহমান—দলের পক্ষ থেকে আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল, ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রী হবেন তিনি। এবারে তিনি প্রথমবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬—উভয় আসনেই জয়ী হয়েছেন। গত বছরের ২৫ নভেম্বর দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে তিনি দেশে ফিরেন এবং ২৭ নভেম্বর ভোটার তালিকায় নাম যুক্ত করা হয়।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা আশির দশকেই শুরু; এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৮৮ সালে গাবতলী (বগুড়া) উপজেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ এবং পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে স্থানীয় নেতা নির্বাচনের সংস্কৃতি চালু করেও তিনি তৃণমূল রাজনীতিতে সাড়া ফেলেন। ২০০২ সালে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাসের সময় তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন এবং পরবর্তীতে সরকারের বিরুদ্ধে বহু আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

আবার উল্লেখ্য, গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ৯ জানুয়ারি দলের স্থায়ী কমিটি তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়।

দেশীয় পার্লামেন্টারি শৃঙ্খলা ও ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই ফলাবলি রাজনৈতিক দলে—দলে বিবর্তন ও নতুন সমীকরণ তৈরি করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশ ও ভোট গণনার চূড়ান্ত জবাবদিহি পর্বের পরই সরকার গঠন-কায়দা ও বিরোধী দলের ক্ষমতা বিস্তারের চূড়ান্ত রূপ সামনে আসবে।