প্রচারণার দ্বিতীয় দিনে ভোটময় উত্তেজনা: অভিযোগ, হামলা ও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণার দ্বিতীয় দিনে রাজধানীর অলিগলি থেকে জেলা শহর পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা দলীয় জনসভায় একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ করেছেন এবং একই দিনের কয়েকটি সহিংসতায় ভোটপ্রক্রিয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়েছে।

তারেক রহমানের জনসভা

বিএনপি চেয়ারম্যান ও ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী তারেক রহমান সন্ধ্যায় ভাসানটেকের বিআরবি স্কুল মাঠে বিশাল নির্বাচনি জনসভায় অংশ নেন। তিনি সেখানে বলেন, ‘‘দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকার অপরিহার্য। গত ১৫ বছরে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে ‘ডামি’ নির্বাচন করা হয়েছে; এবার জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার সময় এসেছে।’’ তিনি সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এলাকায় গৃহহীনদের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দেন।

জামায়াতের উত্তর সফর

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান উত্তরাঞ্চলে ব্যস্ত সময় কাটান। পঞ্চগড় চিনিকল মাঠে জনসভা করে তিনি দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে সমাবেশে অংশ নেন। দিনাজপুরে তিনি বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘‘আমরা চাঁদাবাজি করি না এবং করতে দেবো না। অর্থের বিনিময়ে বিচার কেনা যাবে না; আইন সবার জন্য সমান হবে।’’ একই সময়ে খুলনায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার তারেক রহমানের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন।

কেরানীগঞ্জে গুলির ঘটনায় উদ্বেগ

গত রাতে কেরানীগঞ্জে নির্বাচনি কার্যালয়ের পাশে হযরতপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাসান মোল্লাকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। গুরুতর অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘‘নির্বাচন বানচাল করতে একটি বিশেষ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এই গুপ্ত হামলা চালাচ্ছে।’’

নারায়ণগঞ্জে ইসলামী আন্দোলনের কথা

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির (চরমোনাই পীর) মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম ফতুল্লার ফাজেলপুরের জনসভায় বলেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিমুক্ত করার সুযোগ এসেছে। তিনি জানান, তারা প্রথমে পাঁচ দল ও পরে আট দলে গঠনের মাধ্যমে ইসলামের আদর্শ বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন, তবে কিছু দল এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে এবং শরিয়া অনুযায়ী দেশ পরিচালনার আশ্বাস রেখে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করছে। (নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের প্রার্থী মুফতি ইসমাইল সিরাজীর সমর্থনে এসব বক্তব্য বলা হয়েছে।)

আক্রমণ ও উত্তেজনা: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

ঢাকা-৮ আসনের ১০ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী গণসংযোগে গেলে একটি ভবনের ওপরে থেকে অননুমোদিত ব্যক্তি একে লক্ষ্য করে ডিম ও নোংরা পানি নিক্ষেপ করেন। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। পাটওয়ারী তার কর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান।

নাহিদ ইসলামের হুঙ্কার

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম বাড্ডার বাঁশতলা এলাকায় সমাবেশে বলেন, ‘‘১০ দলীয় জোটের গণজোয়ার দেখে একটি বড় দল ভয় পেয়েছে এবং বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।’’ তিনি চাঁদাবাজি ও ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে প্রতিহত করার কথা বলেন।

বাক্যযুদ্ধে বিএনপি-জামায়াত

নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের মধ্যে তীব্র বাক্যযুদ্ধ চলছে। ঢাকা-৭ এলাকার বিএনপি প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন একটি সভায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘‘বিএনপি চাইলে ঢাকায় জামায়াত-শিবিরকে রাস্তায় নামতে দেওয়া হবে না।’’

অন্যদিকে খুলনায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বিদেশে থাকা কোনো ব্যক্তির বক্তব্যকে তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘‘লন্ডন থেকে কোনো ব্যক্তি আমাদেরকে কুফরি ফতোয়া দিচ্ছেন—এটি অত্যন্ত বাড়াবাড়ি।’’ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বিএনপি ঘোষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’কে সমালোচনা করে বলেন, ‘‘কেউ ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে যদি বাসায় যায়, তাকে আটকে রাখার মত পরিস্থিতি তৈরি করবেন না।’’

প্রচারণার তৃতীয় দিনে পরিস্থিতির ওপর সাধারণ মানুষের উদ্বেগ থাকতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র সমালোচনা ও স্থানেম 경ে ঘটে যাওয়া সহিংসতার ঘটনায় নির্বাচন শৃঙ্খলা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকার আহ্বান রয়েছে।