জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে আগামীকাল মঙ্গলবার দলটির নির্বাচনী আসনের সমঝোতার ঘোষণা দেওয়া হতে পারে। এ বিষয়ে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, আগামীকাল বা পরশু দিন এর চূড়ান্ত বিষয়ে জানানো হবে। সব দল একসঙ্গে গণমাধ্যমের সামনে আসবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
সোমবার দুপুরে রাজধানীর বসুন্ধরায় জামায়াতের কার্যালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবসের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শফিকুর রহমান জানান, ইইউ প্রতিনিধিদের কাছ থেকে সব দলের জন্য সমান সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ কী-না, তা জানতে চাওয়া হয়। জামায়াত অভিযোগ থাকলেও এখনই তা প্রকাশ করবে না বলে জানানো হয়েছে, বরং আগে নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এর সব বিষয় তুলে ধরা হবে। কোনো সমাধান না হলে, জনগণের কাছে জানানো হবে।
জামায়াতের আমির আরও বলেছেন, যদি সরকার গঠন হয়, তাহলে প্রতিবেশীসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে—তা তারা নিশ্চিত করে দিয়েছে। তাঁরা আশা করেন, জামায়াতের সঙ্গে অন্যান্য দেশের শান্তিপূর্ণ ও সভ্য রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক বজায় থাকবে। বিশেষ করে প্রতিবেশীদের সঙ্গে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান, যেখানে পারস্পরিক সম্মান আর সমতার ভিত্তিতে আচরণ হবে। তারা দেশের সার্বভৌমত্ব ও সার্বজনীন বন্ধুত্ব বজায় রাখতে চান, কোনো একটি রাষ্ট্রের প্রতি ঝুঁকে না থেকে।
নারী নিরাপত্তা নিয়েও জামায়াতের গুরুত্ব রয়েছে। শফিকুর রহমান জানান, তারা বিশ্বাস করেন, মা-বোনেরা এবার জামায়াতকে ভোট দেবেন। তাঁদের মধ্যে ইতোমধ্যে এই বার্তা পৌঁছে গেছে। তবে জামায়াতের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেওয়া নারীদের বিরুদ্ধে বাধা দেওয়া, হিজাব খুলে নেওয়া কিংবা তাড়ানোর মতো ঘটনাও ঘটে গেছে। তিনি বলেন, সব শ্রেণি-পেশার, বয়সের ও লিঙ্গের মানুষকে সম্মান দেওয়া রাজনৈতিক দায়িত্ব, কারও অপমান বা অপপ্রচার তার জন্য জায়গা নেই।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, তারা আশাবাদী, আগামী নির্বাচনে জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে। জামায়াত এক সুস্থ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জনগণের ভোটে পরিবর্তন আসবে, এই প্রত্যাশা রাখছেন তারা। পাশাপাশি বলেন, নির্বাচন চলে গেলে কোনো পক্ষ বা দল হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে, তবে ট্রাইব্যুনালগুলোও জবাবদিহি ও দায়শীল থাকবে।
গত ৫৪ বছর রাজনীতি দেখে জনগণ অনেক হতাশ। তাদের মতে, নতুন কিছু দেখতে চায় এখন। এজন্য বিভিন্ন কমিশন দীর্ঘ সময় ধরে বৈঠক চালিয়ে গেছে। দায়িত্বশীল ও সংস্কারমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সকল দলের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। দুর্নীতি বিরোধী পদক্ষেপ, ন্যায়বিচার ও নানা পরিবর্তন সাধনে সবাই এগিয়ে আসুক।
জামায়াত জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের উন্নয়নে তাদের পাশে থাকুক। তারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে, কারণ মনে করে, দেশ সাধারণ জনগণের পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছে। তাঁদের বিশ্বাস, দেশের স্বার্থে সবাই যাতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’= ভোট দেন, সেটাই জরুরি।
শফিকুর রহমান সতর্ক করে বলেন, ‘এবারের নির্বাচন হাতছাড়া হলে জাতিকে তার জন্য মূল্য দিতে হবে।’ তিনি বলেন, দেশের সবার জন্য গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে জামায়াত একেবারেই আশাবাদী। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত মিডনাইট ইলেকশনে অংশ নেয়নি তারা। এবার এ ধরনের পরিবেশ তৈরি হলে তা ছেড়ে দিতে লজ্জাজনক হবে বলেও উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচনের জন্য সকলের সচেতন হওয়া প্রয়োজন, যাতে কেউ যেনো নির্বাচন বিকৃত বা বিলম্বিত করতে না পারে।
প্রশ্নের জবাবে তিনি জানিয়ে বলেন, বর্তমান সরকারি দলে অনেকেই আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে কাজ করছেন। তবে তারা বলছেন, সেসব পরিবর্তন হবে, অন্যথায় তাদের বদলাতে বাধ্য করা হবে।
গণমাধ্যমের এক পক্ষের পক্ষে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, আমরা চাই, জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে। দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ দলের প্রধান হিসেবে তারা বলছেন, গণমাধ্যম যেন নিরপেক্ষ হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের রোল একেবারে নিরপেক্ষ হওয়া দরকার। আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী, সব গণমাধ্যমের উচিত সত্যনিষ্ঠ ও অকপট প্রকাশ করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে কিছু গণমাধ্যমের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, জনগণ যথেষ্ট সচেতন। সাংবাদিকরা দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখলে, তাদের মূল্যায়ন করবে। গণমাধ্যমকে পরিষ্কারভাবে সত্যের পক্ষে থাকতে হবে, সাদাকে সাদাক্রান্তেম বলে জেনে নেওয়া উচিত।
ইইউ এবার বাংলাদেশে কোনো প্রতিনিধিদল পাঠাবে কি না, এমন প্রশ্নে শফিকুর রহমান জানায়, তারা ২০০ প্রতিনিধি পাঠাচ্ছে, যাতে তারা সব জেলা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করবে।
উল্লেখ্য, এর আগে বিভিন্ন আলোচনায় জামায়াতের সাথে আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন দলের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, শিক্ষাবিদ যুবায়ের আহমেদ, জামায়াতের পররাষ্ট্রউপদেষ্টা মাহমুদুল হাসানসহ অন্যান্য সদস্য।
Leave a Reply